খুলনা মেডিকেল; নামেই আছে ক্যানসার বিভাগ, মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা
খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৪:৪৬ পিএম

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যানসার রোগীদের অন্যতম প্রধান ভরসা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। শুধু খুলনা বিভাগই নয়, বরিশাল ও রাজশাহী থেকেও প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসেন এখানে। কিন্তু জনবল, অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। 

ভুক্তভোগীরা বলছেন, খুলনা মেডিকেলের গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটিতে কোনো রোগীকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শুধুমাত্র আউটডোরে চিকিৎসা নিয়েই ফিরে যেতে হয়। যা অত্যন্ত কষ্টকর ও ব্যয়বহুল। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভাগটিতে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, নানা দুর্ভোগের মধ্যে এখানে ক্যানসার রোগীদের অনেকটা অত্যাবশ্যকীয় কেমোথেরাপির সমস্যা প্রকট। ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে কেমোথেরাপি বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পাওয়া গেলেও খুলনা মেডিকেলে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এছাড়া এখানকার চিকিৎসক-কর্মরতদের অধিকাংশই বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকায় রোগীদের সেখানে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন।

আরও পড়ুন : রাণীনগরে যুবদলের প্রতিবাদ মিছিল

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আল মাসুম খান বলেন, খুলনা মেডিকেলের ক্যানসার বিভাগ শুধু নামেই চলছে, কাঙ্ক্ষিত সেবা নেই। এ বিভাগে কর্মরতরা একইস্থানে দীর্ঘদিন চাকরি করায় একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। কমিশন বাণিজ্যের কারণে সরকারি সেবার চেয়ে তারা বেসরকারি পর্যায়ের ক্লিনিক-হাসপাতালগুলোতে রোগী পাঠাতে বেশি মনোযোগী।

অবশ্য চিকিৎসকদের বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্টার এ অভিযোগ এড়িয়ে প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় একইস্থানে কর্মরত থাকা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. মুকিদুল হুদা দাবি করেন, তার বিভাগে ৮ জন চিকিৎসক এবং ২৪ জন লোকবল-প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। প্রয়োজনীয় লোকবল, অবকাঠামো ও মেশিনপত্র সংকটের পরও বছরে তারা প্রায় ২০০০ রোগীকে সেবা দিচ্ছেন। 

বংশগত, পরিবেশগত ও কিছু জীবনাচরণের কারণেই ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা এ অঞ্চলে উর্ধ্বমুখী। তবে ব্রেস্ট ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যাই আমারা বেশি পাচ্ছি। আমাদের নিজস্ব ইনডোর নেই। যে কারণে এখানে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারপরও জটিল কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের হাসপাতালের অন্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ব্লাড ক্যানসার বাদে অন্য রোগীদের এখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

আরও পড়ুন : অপপ্রচার ও শিষ্টাচারবহির্ভূত রাজনীতির বিরুদ্ধে রাণীশংকৈলে যুবদলের বিক্ষোভ

চিকিৎসক মুকিদুল আরও বলেন, প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর (রেডিওথেরাপি) মেশিনটি দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় ভবনের প্রবেশ মুখে ফেলে রাখায় যন্ত্রটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় কার্যত এখন লোহা-যন্ত্রাংশে পরিণত হয়েছে। ২০১১ সালে কেনা মেশিনটি ২০১২ সালের মে মাসে এখানে পৌঁছালেও তা স্থাপন করা যায়নি। মেশিনটি স্থাপন না হওয়ায় এখানকার রোগীদের ঢাকা বা দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে।

মেশিনটি স্থাপন না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, মেশিনটি কেনার সময় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি না থাকার বিষয়টি জেনেও তখন তা উপেক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় সুরক্ষিত বাংকারই নির্মাণ করা যায়নি। বাংকার নির্মাণের জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও ভবনে বাংকার করার সুযোগ না থাকায় সেই অর্থ ফেরত যায়।

কেন এমন ঘটনা এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত-এমন প্রশ্নে বিভাগটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য একজন চিকিৎসক বলেন, এ বিষয়ে আপনারা খোঁজখবর নিয়ে দেখেন। বিষয়টিকে তিনি বড় রকমের দুর্নীতির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে কেনাকাটাতেই তো আসল মজা।

আরও পড়ুন : পূর্বধলায় আওয়ামী লীগে নাশকতা টেকাতে বিএনপি'র বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত

চিকিৎসক মুকিদুল বলেন, তবে আশার কথা হচ্ছে হাসপাতালের বর্তমান ক্যানসার চিকিৎসা ভবনের পাশেই বিভাগীয় ক্যানসার হাসপাতালের নির্মাণ কাজ চলমান। প্রকল্পের আওতায় দুটি বেজমেন্টসহ ১৫ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে ৪৫০টি শয্যা চালু হবে। এর মধ্যে ১৮২টি শয্যা ক্যানসার চিকিৎসার জন্য এবং বাকিগুলো হৃদরোগ ও কিডনি চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হবে।

গণপূর্ত ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের পৃথক তিনটি ইউনিট চালুর প্রেক্ষাপটে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে হাসপাতালের বহির্বিভাগের পেছনে ২৩ হাজার ২৫০ দশমিক ৪৬ বর্গমিটার জমি নির্ধারণ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ভবন নির্মাণের জন্য এমবিপিএল ও এসএনবিপিএল (জেভি) ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গণপূর্ত বিভাগের চুক্তি হয় ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর। ২৮০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২২টি প্যাকেজে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে।  

গণপূর্ত বিভাগ খুলনা-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, গণপূর্ত বিভাগ সরকারি অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলো গুণগতমান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। তবে নানা কারণে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণকাজ প্রকল্পের কাজ শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, মেয়াদ বেড়েছে। বর্তমানে দ্রুত গতিতে কাজ এগোচ্ছে। প্রকল্পের মূল ভবন নির্মাণের অবকাঠামোগত কাজের ৯৫ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন : সন্দ্বীপ সারিকাইতে ইয়াবাসহ আটক ১, ভ্রাম্যমান আদালতে এক বছরের কারাদণ্ড

কামরুল হাসান আরো উল্লেখ করেন, এছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালের বার্ন ইউনিট নির্মাণ কাজ নতুন দরপত্রের মাধ্যমে পুনরায় শুরু হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে যা সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে। এর আগে কোভিড-১৯ প্রকল্পের আওতায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং খুলনা সদর হাসপাতালে ১০টি করে আইসিইউ শয্যা ও খুলনা সদর হাসপাতালে ২০টি আইসোলেশন শয্যা স্থাপন করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক কাজী আইনুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে জনবল সংকটসহ নানা সমস্যা রয়েছে। সেই ৫০০ বেডের জনবল দিয়েই এখনো চলছে কার্যক্রম। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় তিন থেকে চার গুণ বেশি রোগী থাকায় চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি ২০২৫ সালের অগস্টে যোগদানের পর সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আইনুল আরও বলেন, ২০১২ সাল থেকে হাসপাতালের ক্যানসার বিভাগের লিনিয়ার এক্সিলারেটর (রেডিওথেরাপি) মেশিনটি বাক্সবন্দি অবস্থায় থাকায় ক্যানসার রোগীদের সেবা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলকে আমরা অনেক বার জানিয়েছি। তবে হাসপাতালের বহির্বিভাগের পেছনে চলমান ক্যানসার হাসপাতালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্যান্সার চিকিৎসা সেবায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। সর্বাধুনিক পর্যায়ের সেবা মিলবে। এতে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ও কমে আসবে।

জ/দি

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft