
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) দীর্ঘদিন ধরে চলা দৈনিক মজুরিভিত্তিক (ডে-লেবার) ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও আর্থিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে প্রশাসন। তদন্তের প্রথম দিনেই দেড় শতাধিক কর্মচারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। নিয়োগের উৎস, ইউজিসির অনুমোদন, প্রকৃত জনবল চাহিদা এবং কর্মীদের কার্যক্রম যাচাইয়ের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে অস্থায়ী কর্মচারীদের মধ্যে ছাঁটাই আতঙ্কও দেখা দিয়েছে।
ক্যাম্পাস সূত্রে, গতকাল রোববার (২১ জুন) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন উপ-রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) এ.জেড.এম. আছাফদ্দৌলা এবং সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উপ-হিসাব পরিচালক ইশরাফুল হক।
এদিকে গতকাল গঠিত তদন্ত কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে আজ থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে। সোমবার (২২ জুন) তদন্তের প্রথম দিনে ১৬২ জন ডে-লেবার কর্মচারীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা, বৈধতা, ইউজিসির অনুমোদন, শূন্যপদ ও আর্থিক প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখছে কমিটি।
এবিষয়ে কমিটির সদস্য উপ-হিসাব পরিচালক ইশরাফুল হক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডে-লেবার নিয়োগের সার্বিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করতেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরে প্রকৃত জনবল চাহিদা ছিল কি না, শূন্যপদ ছিল কি না, ইউজিসির অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ রয়েছে কি-না। মূলত এসকল বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিয়োগপ্রাপ্তদের নথিপত্র ও তথ্যের সত্যতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত মোট ২১৫ জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। প্রথম দিনে ১৬২ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে বাকিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্ভব হয়নি। অবশিষ্ট ডে-লেবার কর্মচারী এবং মাসিক চুক্তিভিত্তিক (থোক) কর্মচারীদের সাক্ষাৎকার পরবর্তী কার্যদিবসে নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও উপ-রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) এ.জেড.এম. আছাফদ্দৌলা বলেন, 'ইউজিসি থেকে এসব অস্থায়ী ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীর জন্য অতিরিক্ত কোনো বাজেট বরাদ্দ দেয় না। এ খাতে বছরে মাত্র ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও দুইশতাধিক কর্মচারীর কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা। ফলে প্রতি বছর দুই কোটিরও বেশি টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ খাত থেকে সমন্বয় করতে হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, '২০১২ সালের পর ইউজিসির কড়াকড়ির কারণে স্থায়ী নিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিভিন্ন মেয়াদে ডে-লেবার ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়তে থাকে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর মেয়াদে প্রায় ১৩৫ জনের বেশি ডে-লেবার নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সালামের মেয়াদে এ সংখ্যা ১০৮ থেকে কমিয়ে ৪৫ জনে নামিয়ে আনা হয়েছিল।”
প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে কয়েকজনের বেশকিছু অসঙ্গতিও সামনে এসেছে বলে জানান তিনি। অনেক দপ্তরে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কর্মচারী থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে ২০ জন শিক্ষকের বিপরীতে মাত্র একজন পিয়ন কর্মরত আছেন। কাজের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ ১৫ দিন কাজ করেও ২০ দিনের বিল দাবি করেছেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। এছাড়া কে কোন প্রক্রিয়ায় বা কার সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তবে তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় মন্তব্য করতে রাজি হননি কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন। তিনি বলেন, তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তবে এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দৈনিক মজুরিভিত্তিক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্যও শোনা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডে-লেবার ও থোক বরাদ্দের ভিত্তিতে অস্থায়ী নিয়োগের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এরপর থেকেই এসব নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক সৃষ্টি হয়। গত ৪ মার্চ সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতিকে তাঁর কার্যালয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ডে-লেবার কর্মচারী ছিলেন। এছাড়া গত ৭ জুন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের এক শাখা কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগও ওঠে এক ডে-লেবার কর্মচারীর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে এসব অস্থায়ী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে।
এদিকে কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিজেদের স্থায়ীকরণের দাবিতে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে নিয়োগের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হবে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মচারী বলেন, গত প্রশাসনের সময়ে আমরা বিভিন্ন চ্যানেল দিয়ে, কেউ কেউ ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ করে নিয়োগ পেয়েছি। অনেকে বেশকিছু অর্থও প্রদান করেছে এই নিয়োগ পেতে। এখন যদি নিয়োগ বাতিল হয়ে যায়। তাহলে তো আমরা গরীব মানুষ। আমাদের উপায় কি হবে!
এদিকে এবিষয়ে বলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “দায়িত্ব গ্রহণের পর আমি দেখেছি, আমার যোগদানের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দৈনিক মজুরিভিত্তিক বেশ কিছু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ঈদুল আজহার আগে এসব কর্মচারীর বেতন বাবদ প্রায় ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। অথচ এ খাতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বা সরকারের কোনো অনুমোদন কিংবা আর্থিক বরাদ্দ নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা আর্থিকভাবে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, ‘কোন প্রেক্ষাপটে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এর যৌক্তিকতা কী এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা বিধিসম্মত ছিল—সেসব বিষয় খতিয়ে দেখতে গতকাল একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা দপ্তরে প্রকৃত জনবল চাহিদা, শূন্যপদ এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি-বিধান অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে।’
উপাচার্য আরও বলেন, ‘যেসব পদে প্রকৃত প্রয়োজন রয়েছে এবং শূন্যপদ আছে, সেসব ক্ষেত্রে বিধি অনুযায়ী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে বর্তমানে দৈনিক মজুরিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।’
তিনি বলেন, ‘ডে-লেবার নিয়োগকে কেন্দ্র করে অতীতে বিভিন্ন বিতর্ক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। তাই বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করতেই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
জ/উ