
বিদেশ ভ্রমণ এখন আর শুধু বিলাসিতার বিষয় নয়। পড়াশোনা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা অবকাশ-বিভিন্ন কারণে প্রতিবছর হাজারো বাংলাদেশি দেশের বাইরে যান। তবে প্রথমবার বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা, ইমিগ্রেশন, লাগেজ ব্যবস্থাপনা কিংবা বিদেশে চলাফেরা নিয়ে অনেকের মধ্যেই কিছুটা দুশ্চিন্তা থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে প্রথম বিদেশ সফরও হতে পারে নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও ঝামেলামুক্ত।
বিদেশে যাওয়ার আগে প্রথমেই পাসপোর্ট ও ভিসার মেয়াদ যাচাই করা জরুরি। অনেক দেশে প্রবেশের জন্য পাসপোর্টের মেয়াদ কমপক্ষে ছয় মাস থাকতে হয়। পাশাপাশি ভিসার ধরন, মেয়াদ, প্রবেশের তারিখ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং, ফেরার টিকিট, প্রয়োজন হলে ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স এবং আমন্ত্রণপত্রসহ প্রয়োজনীয় নথির প্রিন্ট ও ডিজিটাল কপি সংরক্ষণ করে রাখলে যেকোনো সময় সহজে ব্যবহার করা যায়।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের অন্তত তিন ঘণ্টা আগে বিমানবন্দরে পৌঁছানো ভালো। এতে চেক-ইন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, লাগেজ জমা এবং ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে অযথা তাড়াহুড়ো করতে হয় না।
লাগেজ গোছানোর সময় সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের ওজনসীমা ও নীতিমালা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। হ্যান্ডব্যাগে পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস, প্রয়োজনীয় ওষুধ, মোবাইল চার্জার, নিয়ম অনুযায়ী পাওয়ার ব্যাংক, একটি কলম এবং কিছু নগদ অর্থ রাখা উচিত। মূল্যবান জিনিসপত্র চেক-ইন লাগেজে না রাখাই নিরাপদ।
গন্তব্য দেশের কিছু স্থানীয় মুদ্রা সঙ্গে রাখা এবং আন্তর্জাতিক ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়া সুবিধাজনক। বিদেশে কার্ড ব্যবহারের আগে ব্যাংককে বিষয়টি জানিয়ে রাখলে লেনদেনে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
বিদেশে পৌঁছে কীভাবে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন, সে পরিকল্পনাও আগে থেকে করে রাখা ভালো। আন্তর্জাতিক রোমিং, স্থানীয় সিম অথবা ই-সিম-যেটি সুবিধাজনক, সেটি আগে থেকেই নির্ধারণ করলে যোগাযোগ সহজ হয়।
ইমিগ্রেশনে কর্মকর্তার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট ও সত্য উত্তর দেওয়া উচিত। সাধারণত সফরের উদ্দেশ্য, কোথায় অবস্থান করবেন এবং কতদিন থাকবেন-এসব বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রয়োজনীয় নথি হাতের কাছেই রাখলে প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।
প্রতিটি দেশের আইন, সামাজিক রীতি ও সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে। কোথাও পোশাক, কোথাও ধূমপান বা ছবি তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই যাত্রার আগে গন্তব্য দেশ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের যোগাযোগ নম্বর, হোটেলের তথ্য, স্থানীয় জরুরি সেবা নম্বর এবং পরিবারের একজন সদস্যের নম্বর সংরক্ষণ করে রাখা উচিত। গুরুত্বপূর্ণ নথির ডিজিটাল কপিও নিরাপদ ক্লাউড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত সেবন করা ওষুধ সঙ্গে রাখা, প্রয়োজনে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বহন করা এবং গন্তব্য দেশের প্রয়োজনীয় টিকা বা স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে নেওয়া ভালো।
বিশেষজ্ঞরা কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলারও পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন-শেষ মুহূর্তে বিমানবন্দরে পৌঁছানো, অতিরিক্ত লাগেজ নেওয়া, পাসপোর্টের মেয়াদ যাচাই না করে টিকিট কাটা, প্রয়োজনীয় নথির কপি না রাখা, স্থানীয় আইন সম্পর্কে ধারণা না নেওয়া, বিদেশে মোবাইল ডেটার ব্যবস্থা না করা এবং অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া ব্যাগ বা প্যাকেট বহন করা।
নিরাপদ ভ্রমণের জন্য বিমানবন্দর ও পর্যটন এলাকায় নিজের লাগেজ সবসময় নজরে রাখা, অপরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে কোনো ব্যাগ বহন না করা, পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে ব্যাংকিং বা সংবেদনশীল তথ্য আদান-প্রদান থেকে বিরত থাকা এবং জরুরি অর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ নথি এক জায়গায় না রেখে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সঠিক পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং সচেতনতা থাকলে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ হতে পারে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও স্মরণীয় একটি অভিজ্ঞতা।
জ/উ