
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শেষ হওয়ার আগে সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করছে না সরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি অনেকাংশেই আইএমএফের মতামত ও সম্মতির ওপর নির্ভর করছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও দুর্বল রাজস্ব আহরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইএমএফ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার।
রোববার (২৬ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি, সরকারি ব্যয়, প্রস্তাবিত পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণের নির্দেশ দেন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্য, গ্যাস সরবরাহ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় রাখার কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার সময় এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ওই আলোচনায় অনুন্নয়ন খাতের স্থায়ী ব্যয়, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে আইএমএফের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসে বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অর্থ বিভাগের বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতা বাজেটিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে আইএমএফ জানিয়েছে, বর্তমান রাজস্ব কাঠামো বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি বহনের মতো পর্যাপ্ত শক্তিশালী নয়।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সেই তুলনায় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে নতুন পে স্কেল চালু করলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে নতুন পে স্কেলের পরিকল্পনা থেকে সরকার সরে আসেনি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর সুপারিশ পর্যালোচনা করে একটি সংশোধিত কাঠামো প্রস্তুত করেছে। প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, আর্থিক চাপ কমাতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন কিংবা বিকল্প পদ্ধতির বিষয় বিবেচনা করছে সরকার। অক্টোবরে আইএমএফের বৈঠকের আগেই এ বিষয়ে কৌশল নির্ধারণ করা হতে পারে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, যাতায়াত ভাতা সংশোধন এবং অন্যান্য ভাতা পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ রয়েছে।
কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন খাতে এ উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সম্ভাব্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ছাড়া নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে, যা বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
জ/উ