
বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়ে ঋণ নির্ভর উচ্চাভিলাষী বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। একদিকে তহবিল সংকটে যখন সরকার ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা ধার করে চলছে, বাড়ছে বিদেশি ঋণও, ঠিক এমন অবস্থায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থের বড় অংশই পূরণ করা হবে দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে। শুধু তাই নয়, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির শঙ্কা মাথায় রেখে বাজেট সহায়তা হিসেবে আরো প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইআরডি সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরে যত টাকা বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, এত ঋণ এর আগে কখনো নেওয়া হয়নি।
ইআরডি সূত্র জানায়, গত অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় এবার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা। আর সংশোধিত এডিপির তুলনায় প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে সরকার ঋণ ছাড় করতে পেরেছে মাত্র ৪৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু যে সময়ে সরকার নতুন ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, ঠিক সেই সময়েই দেশের ওপর পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মোট প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার আসল এবং প্রায় ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সুদ। শুধু ২০২৯-৩০ অর্থবছরেই প্রায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে, যা হবে সর্বোচ্চ চাপের বছর। অর্থনীতিবিদরা মতে, বড় বড় প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন থেকে আসল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কিস্তি আগামী বছরগুলোতে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফলও এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। ফলে ঋণের চাপ অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ কোটি ডলার বেশি। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৫ কোটি ডলার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। মূলত বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি অর্থবছরে এ পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইআরডি সূত্র জানায়, রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আট মাসের হিসাবে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এমন বাস্তবতায় সরকার বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকছে। সরকারি ব্যয় কমানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে ব্যয়ের চাপ কমছে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চ -এই তিন মাসেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ। এর ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করছে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যা শেষ পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যেই উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে নতুন করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পরবর্তী কিস্তি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সংস্থাটি নতুন কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়নি। মূলত সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণেই এই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দামও সমন্বয় করেছে। যদিও সরকার বারবার বলেছে আপাতত জ্বালানির দাম বাড়ানো হবে না; কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করে কম দামে বিক্রি করায় বড় অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছিল। আইএমএফও ভর্তুকি কমানোর চাপ দিচ্ছিল। ফলে আর্থিক চাপ সামাল দিতেই সরকারকে জ্বালানির দাম বাড়াতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এর প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে।
ইআরডি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে এ ব্যয় আরো বেড়ে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে জ্বালানি ভর্তুকিও বাড়ছে। এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও নতুন বেতন কাঠামোর চাপ যোগ হওয়ায় বাজেটের আকারও বড় হচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।