মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছে ইসলামি দলগুলোর নারী শাখা
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৭:২৩ পিএম

দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসলামি দলগুলোর নারী বিভাগ। জোটবদ্ধভাবে মাঠের আন্দোলন ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে তারা রাজনৈতিকভাবে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে দলগুলোর নারী উইং বা নারী শাখার তৎপরতাও বাড়তে শুরু করেছে। রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ও নারীর অধিকার আদায়ে কাজ করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে দলগুলো জানিয়েছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে তাদের শক্তিশালী নারী উইংয়ের মাধ্যমে সংগঠিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি দলও তাদের মহিলা বিভাগকে পুনর্গঠন ও সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও কোথাও আলাদা ছাত্রী উইং গঠনের প্রস্তুতিও চলছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারী শাখা পুনর্গঠন
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা নারী কার্যক্রম নতুন করে সংগঠিত করতে যাচ্ছে আল্লামা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। শুক্রবার (১৫ মে) ঢাকায় দলের আমির মাওলানা মামুনুল হকের বাসায় এ বিষয়ে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের মাধ্যমে তালিম ও ধর্মীয় কার্যক্রম চললেও তা দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল না। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম কেন্দ্রীয় সংগঠনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দলের দায়িত্বশীলরা জানান, আগে ‌‘মহিলা মজলিস’ নামে যে কাঠামো ছিল, তা প্রায় ২০–২৫ বছর আগে থেকে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এবার তা পুনরায় সক্রিয় করে দলীয় কাঠামোর মধ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক হাসান জুনায়েদ বলেন, ‘আমরা এখন এটিকে ‘নারী শাখা’ হিসেবে সংগঠিত করছি। এতদিন এটি অনানুষ্ঠানিকভাবে বিভিন্ন এলাকায় আলাদা উদ্যোগে চলছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় কোনো কাঠামো ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নারীদের মাধ্যমে তালিম ও ধর্মীয় কার্যক্রম চললেও তা দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল না। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব কার্যক্রমকে কেন্দ্রীয় সংগঠনের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে শুক্রবারের বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না-ও হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দুই থেকে তিনজন দায়িত্বশীলকে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে ১১ দল মনোনীত সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মাহবুবা হাকিম নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন।

হাসান জুনায়েদ আরও বলেন, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সফর ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে নারী শাখার সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে সংগঠন বিভক্ত হওয়ার পর আগের ‘মহিলা মজলিস’ কার্যক্রম আর এককভাবে চালু ছিল না। বর্তমান উদ্যোগকে সংগঠন পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জামায়াতের মহিলা বিভাগ ও ছাত্রী সংস্থা
জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মহিলা বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দলের মোট কর্মী সংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ নারী। নারী শাখার সদস্য কাঠামো তিন স্তরে বিভক্ত সহযোগী সদস্য, কর্মী ও রুকন। এর মধ্যে রুকন সর্বোচ্চ স্তর।

দলীয় তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় অর্ধলাখ নারী রুকন (সদস্য) এবং প্রায় চার লাখ কর্মী নারী শাখায় যুক্ত রয়েছেন। সারাদেশে রয়েছে অসংখ্য সহযোগী সদস্য।

ছাত্রী সংস্থায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ নেতা-কর্মী রয়েছে। ছাত্রী সংস্থা ফ্যাসিস্ট আমলে নানা নির্যাতন ও মামলা-হামলার শিকার হয়েছে। পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে তা কম নয়। তবুও আমাদের ছাত্রীরা কাজ করে গেছে। তারা এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি রয়েছে। জেলা ও উপজেলা শহরেও কমিটি রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ জানায়, নির্বাচনী রাজনীতিতেও নারী বিভাগের অংশগ্রহণ রয়েছে। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ৩৬ জন নারী ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২ জন। এছাড়া ২০০১–২০০৫ মেয়াদে চারজন এবং ১৯৯১–১৯৯৫ মেয়াদে দুজন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ছিলেন।

সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে দলটির আটজন নারী মনোনীত হয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নেসা সিদ্দিকা বলেন, ছাত্রী সংস্থায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ নেতা-কর্মী রয়েছে। ছাত্রী সংস্থা ফ্যাসিস্ট আমলে নানা নির্যাতন ও মামলা-হামলার শিকার হয়েছে। পুরুষদের চেয়ে কোনো অংশে তা কম নয়। তবুও আমাদের ছাত্রীরা কাজ করে গেছে। তারা এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি রয়েছে। জেলা ও উপজেলা শহরেও কমিটি রয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের ‘ছাত্রী উইং’
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাংগঠনিক বিস্তার ও নারী ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বাড়াতে নতুন কৌশল নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

দলটি আলাদা ‘ছাত্রী উইং’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ঈদুল আজহার পর আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারে।

ছাত্রী সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং তাদের উপযোগী করে কর্মসূচি উপস্থাপন করা। এর মাধ্যমে সংগঠনের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ইসলামী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা, ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নারী বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পর থেকে কমিটি গঠনের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। দলটি তাদের নারী কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ ও কার্যক্রমে কিছুটা ‘জেনারেশন গ্যাপ’ তৈরি হওয়ায় এবার আলাদা ছাত্রী সংগঠন গঠনের পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি। এ বিষয়ে নেতারা জানিয়েছেন, প্রচলিত নাম পরিবর্তন করে এটি ‘ছাত্রী আন্দোলন’ নামে কার্যক্রম চালানোর চিন্তা করা হচ্ছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক ফজলুল করিম মারুফ বলেন, এই ছাত্রী সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং তাদের উপযোগী করে কর্মসূচি উপস্থাপন করা। এর মাধ্যমে সংগঠনের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউসুফ সাদিক হক্কানী বলেন, খেলাফত আন্দোলনের মহিলা বিভাগ রয়েছে, তবে সেটি খুব শক্তিশালী বা সুসংগঠিত অবস্থায় নেই। আমাদের দল তেমন সরব নয়, নারী বিভাগ নিয়ে। তবে কিছু কিছু জায়গায় কমিটি রয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কার্যক্রমও আছে, যদিও সার্বিকভাবে তা খুব শক্তিশালী নয়।

তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়েও একটি কাঠামো রয়েছে। সেখানে আমাদের দলের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদীর স্ত্রী দায়িত্বে আছেন।

খেলাফত মজলিস
প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে মহিলাদের জন্য বাংলাদেশ ইসলামী মহিলা মজলিস রয়েছে বলে জানিয়েছে খেলাফত মজলিস। এছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রী মজলিস নামেও সংগঠন রয়েছে।

দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও তথ্য সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুল হাফিজ খসরু বলেন, সংগঠনের নিজস্ব গঠনতন্ত্র ও কার্যপ্রণালি আছে। সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। মহিলাদের আলাদা ইউনিট আছে। আমাদের কেন্দ্রীয় খেলাফত মজলিসে নির্বাহী পরিষদে মহিলাদের দুইজন মেম্বার আছে। মহিলা মজলিস নারীদের মাঝে কোরআন হাদিসের পাঠদান, ব্যক্তিগত আমল নিয়ে কাজ করেন। এছাড়া নারী অধিকার বিষয়ক প্রোগ্রাম করেন। ফ্যাসিবাদী আমলে হিজাব ইস্যুতে রাস্তায় প্রতিবাদ করেছেন।

তিনি বলেন, মহিলাদের সংগঠন দেখার জন্য আমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে একজন নায়েবে আমির এই মহিলা বিভাগ দায়িত্বে আছেন। তিনি কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত্বাবধান করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি ইসলামি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম এবং নির্বাচনী অংশগ্রহণ তাদের সংগঠন কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার চাপ তৈরি করেছে। এর অংশ হিসেবেই নারী উইংগুলোকে নতুনভাবে সক্রিয় করা হচ্ছে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft