নেপালের হিমালয় অঞ্চলে অ্যাক্লিমাটাইজেশন ছাড়াই ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ সামিউর রহমান আলিফের দুঃসাহসিক অভিযান

নেপালের হিমালয় অঞ্চলে মাত্র সাত দিনে কোন প্রকার অ্যাক্লিমাটাইজেশন ছাড়াই নিজ প্রচেষ্টায় এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (EBC) পৌঁছে আলোচনায় এসেছেন এক ২৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি ট্রেকার। ৭ জুন ২০২৬, কাঠমান্ডু থেকে সড়কপথে যাত্রা শুরু করে কোনো অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট, গাইড, পোর্টার কিংবা নির্ধারিত অ্যাক্লিমাটাইজেশন (উচ্চতার সঙ্গে অভিযোজন) ছাড়াই তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও চ্যালেঞ্জিং ট্রেকিং গন্তব্য এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোর দাবি করেছেন।
অভিযানের সূচি অনুযায়ী, প্রথম দিনে কাঠমান্ডু থেকে সাল্লেরি, দ্বিতীয় দিনে সাল্লেরি থেকে সুরখে হয়ে ট্রেক শুরু করে ঘাট, এরপর নামচে বাজার, তেংবোচে, দিংবোচে ও লবুচে অতিক্রম করে সপ্তম দিনে গোরাকশেপ হয়ে ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উচ্চতার এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছান তিনি।
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৩৬৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এ উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এ কারণে অধিকাংশ ট্রেকারকে উচ্চতার সঙ্গে শরীর খাপ খাইয়ে নিতে অতিরিক্ত বিশ্রাম বা অ্যাক্লিমাটাইজেশন ডে রাখতে হয়। সকলকিছু মিলিয়ে সাধারণত এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ট্রেক সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ১৪ দিন সময় নেওয়া হয়।
তবে এই অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, পুরো যাত্রাপথে কোনো নির্ধারিত অ্যাক্লিমাটাইজেশন ডে রাখা হয়নি। ফলে উচ্চতাজনিত শারীরিক চাপ, অক্সিজেনের স্বল্পতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে সরাসরি লড়াই করেই এগিয়ে যেতে হয়েছে।
খুম্বু হিমবাহে দিক হারিয়ে সংকট
অভিযানের সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্ত আসে ১৩ জুন, যখন লবুচে থেকে গোরাকশেপ হয়ে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের পথে অগ্রসর হন তিনি, খুম্বু হিমবাহ (মৃত্যুফাদ) এলাকায় তিনি মূল ট্রেইল থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন এবং মুহূর্তেই মুখোমুখি হন এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার।
একাই চলার কারণে সেখানে কোনো গাইড, পোর্টার বা সহযাত্রীর সহায়তা ছিল না। দুর্গম হিমবাহ অঞ্চলে প্রবেশের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। উচ্চতা ৫ হাজার মিটারের বেশি হওয়ায় শারীরিক সক্ষমতার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয় যা মুহূর্তেই জীবন কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
অভিযাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে তার শরীরের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৫৭ শতাংশে নেমে আসে, যা উচ্চতাজনিত পরিবেশে শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলে।
তবে পরিস্থিতির কাছে হার না মেনে তিনি চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পুনরায় সঠিক রুট শনাক্ত করেন এবং গোরাকশেপ হয়ে শেষ পর্যন্ত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেনঃ “আমর চারপাশে কোনো পরিচিত মুখ ছিল না। গাইড ছিল না, পোর্টার ছিল না। ছিল শুধু পাহাড়, প্রতিকূলতা আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, প্রতিটি দিন গুনতে হয়েছে হাজারো চিন্তার ভিরে আমার সেই ছোট্ট একটা স্বপ্নকে ঘিরে”।
ভাষাগত জটিলতায় ভুল পথে যাত্রা
অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল যোগাযোগ সমস্যা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পথনির্দেশনা নিতে হলেও ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব তথ্য স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেননি তিনি।
লবুচের পথে ওঠার আগে স্থানীয়রা আবহাওয়ার অবনতি ও প্রবল বাতাসের কারণে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটি রুট, যা ছিল ফেরিচে হয়ে থুকলা পাস যাওয়ার একমাত্র আদর্শ পথ হিসেবে পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে ভাষাগত ভুল বোঝাবুঝির কারণে তিনি মূলত উচ্চতর ও কঠিন পথেই যাত্রা অব্যাহত রাখেন।
এর ফলে তাকে প্রবল ঠান্ডা বাতাস, দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া এবং ভারী ব্যাকপ্যাক নিয়ে দীর্ঘ সময় উচ্চতায় চলাচলের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
আত্মনির্ভরতার এক ব্যতিক্রমী পরীক্ষা
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেকিং রুট হিসেবে পরিচিত এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ও অভিযাত্রী যান। তাদের অধিকাংশই গাইড, পোর্টার এবং পরিকল্পিত অ্যাক্লিমাটাইজেশন ব্যবস্থার সহায়তা নিয়ে ট্রেক সম্পন্ন করেন।
সেই বাস্তবতায় এককভাবে পুরো যাত্রা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা আত্মনির্ভরতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং অভিযোজন ক্ষমতার একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ২৫ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি তরুণ সামিউর রহমান আলিফকে।
অভিযাত্রীর মতে, “অনেকের কাছে এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু আমার কাছে খুম্বু হিমবাহে পথ হারিয়ে আবার সঠিক পথে ফিরে আসাটাই পুরো অভিযানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল।”
পর্বতাভিযান বিশেষজ্ঞরা অবশ্য উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ এবং শারীরিক সক্ষমতা মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। উচ্চতাজনিত ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
জ/উ