
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুর্গম এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটিতে অবশেষে বড় ধরনের যৌথ অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের প্রায় চার হাজার সদস্য পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। মাটিতে ছিল সাঁজোয়া যান, আকাশে উড়ছিল ড্রোন ও হেলিকপ্টার। অভিযান ঠেকাতে সড়কে ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড এবং কালভার্ট ভেঙে দিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। কিন্তু কৌশলে বাধা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে যান বাহিনীর সদস্যরা।
অভিযানে ১০-১৫ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বেশকিছু অস্ত্র। তবে কী পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বা কাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি কর্মকর্তারা। এদিকে অভিযানের খবর পেয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনসহ কয়েকজন বোরকা পরে পালিয়ে গেছে।
গত ১৯ জানুয়ারি বিকালে এই জঙ্গল সলিমপুরেই সন্ত্রাসীদের হামলায় প্রাণ হারান র্যাব-৭ এর কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব। এছাড়া র্যাবের চার সদস্যকে বেধড়ক মারধরের সেই বর্বরোচিত ঘটনার পর থেকেই এলাকাটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারিতে ছিল। ওই হত্যা মামলার বেশ কয়েকজন আসামি এই দুর্গম পাহাড়েই আত্মগোপন করেছে-এমন তথ্যের ভিত্তিতেই সুপরিকল্পিতভাবে এই বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, অভিযানে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য ছিন্নমূল এলাকার পর আলী নগরের শুরুতে একটি বড় ট্রাক আড়াআড়িভাবে রেখে ব্যারিকেড তৈরি করেছে। এ ছাড়া কিছু দূরে খালের উপরের কালভার্টটি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার পরও আমরা কৌশলে খাল পার হতে পেরেছি।
অভিযানের একপর্যায়ে দুপুরের দিকে সেখানে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ ও বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন। এ সময় ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর আগে চারবার এই এলাকায় অভিযানের চেষ্টা করা হলেও সফল হওয়া যায়নি। এবার যৌথ বাহিনী সফল হয়েছে। অভিযানে বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা অংশ নেন।
তিনি আরও বলেন, অভিযান শেষ হলে এলাকায় স্থায়ীভাবে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে। এখানে পুলিশের একটি ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের একটি ক্যাম্প চালু থাকবে। যাতে ভবিষ্যতে এ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায়। তিনি বলেন, ক্যাম্পের নিরাপত্তা বিধানে যদি এখানে কামান দেওয়া লাগে, আমরা কামান দেব।
বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, সলিমপুর এলাকা শহরের খুব কাছে হওয়া সত্ত্বেও এতদিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। অনেক আগেই এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া উচিত ছিল। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই সমন্বিতভাবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে এলাকায় সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত জটিল হওয়ায় এখানে অভিযান চালানো সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। পাহাড়ের ভেতরে অসংখ্য সরু পথ, গহিন ঝোপঝাড় ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতি থাকায় অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে পারে।
ড্রোন দিয়ে স্পট নির্ধারণ : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযানে একাধিক শক্তিশালী ড্রোন ব্যবহার করেন। অভিযান শুরুর আগেই ড্রোন দিয়ে সন্ত্রাসীদের অবস্থান ও আস্তানা চিহ্নিত করেন তারা। তারপরই যৌথ অভিযান শুরু করেন।
সিসি ক্যামেরা বসিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত সন্ত্রাসীরা : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় প্রবেশ করে শত শত সিসি ক্যামেরা দেখে বিস্মিত হন। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করত সন্ত্রাসীরা। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উপস্থিত হলে সহজেই তারা টের পেয়ে যেত। অভিযানে থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, জঙ্গল সলিমপুর যেন দেশের ভিতরে আরেকটি দেশ। দেশের কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না এখানে।
বোরকা পরে পালিয়েছে সন্ত্রাসী ইয়াসিন : অভিযান শুরুর পরপরই জঙ্গল সলিমপুরের ত্রাস হিসাবে পরিচিত ইয়াসিন বোরকা পরে পালিয়েছে। সন্ত্রাসী ইয়াসিনের একাধিক সোর্স রয়েছে। অভিযানের খবর সোর্সের মাধ্যমে আগেই জেনে গিয়েছিল ইয়াসিন। এক ব্যবসায়ী জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন প্রতিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের খবর টের পেয়ে বোরকা পরে পালিয়ে যান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দুই দশকে সীতাকুন্ড থানার জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের অবৈধ বসতি। গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই অবৈধ বসতি স্থাপন ও পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণ করত তৎকালীন সরকারি দলের কিছু লোক। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের ফেলে যাওয়া অপরাধের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে নিতে কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে চলছিল দখল-পালটা দখলের খেলা। প্রায়ই তাদের মধ্যে সংঘর্ষ, খুনাখুনি হতো। সবশেষ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ছিল রোকন ও গফুর গ্রুপের হাতে। দুজনই বর্তমানে বিএনপির নাম ব্যবহার করে দখলবাণিজ্য পরিচালনা করছিল।
এখানে সন্ত্রাসীদের আয়ের বড় উৎস চাঁদাবাজি ও সরকারি খাসজমি প্লট করে বিক্রি করা। ছোটখাট পাহাড় ও টিলা কেটে গড়ে তোলা ২ থেকে ৪ কাঠার প্রতিটি প্লট ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। কাগজপত্রবিহীন কেবল দখলস্বত্ব বিক্রি করে দিনমজুর ও নিম্নবিত্ত মানুষের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করা হতো।
জ/উ