
রাজধানীর কদমতলীতে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নির্যাতনের পর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অভিযোগ, স্থানীয় থানায় মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানানো হলে নিহতের মা রুনু বেগম শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। আদালতে দাখিল করা অভিযোগে স্বামীর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলার আবেদন করা হয়েছে। আদালত মামলার তদন্ত করতে অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) আদেশ প্রদান করেন।
এদিকে, মামলার বাদী নিহতের মা রুনু বেগমের অভিযোগ কদমতলী থানা পুলিশকে মো. মনির হোসেন মোটা অংকের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করায় তারা হত্যা মামলা নেয়নি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, নিহত সোনিয়া (২৮) প্রায় ১৬ বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের মাধ্যমে মো. মনির হোসেনকে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে তাদের কোনো সন্তান হয়নি। বাদীর অভিযোগ, স্বামীর শারীরিক সমস্যার কারণে সন্তান না হওয়ায় সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মো. মনির হোসেন দীর্ঘদিন ধরে জুয়া ও মাদকাসক্ত ছিলেন। জুয়া ও মাদকের অর্থ জোগাড় করতে তিনি নিয়মিত স্ত্রীকে মারধর করতেন এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দিতেন। টাকা আনতে না পারলে সোনিয়ার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যেত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার রাতে কী হয়েছিল?
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১২ মে রাত প্রায় ১১টার দিকে নিহতের মামা মো. ওয়াহিদ অটোরিকশা গ্যারেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে সোনিয়ার বাসায় যান। অভিযোগে বলা হয়, তিনি প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে দরজায় কড়া নাড়লেও কেউ দরজা খোলেননি। পরে মনির হোসেন দরজা খুলে জানান, তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন এবং ঘুম থেকে উঠে দেখেন সোনিয়া বারান্দার গ্রিলের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে আছেন। কিন্তু সোনিয়ার গলায় ফাঁস লাগানো থাকলেও সে মেঝেতে নামাজ পড়ার মত ভঙ্গিমায় বসা অবস্থায় ছিলেন।
খবর পেয়ে সোনিয়ার মা রুনু বেগম ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে পরিবারের সদস্যরা সোনিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরদিন জুরাইন কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
‘হত্যা আড়াল করতে আত্মহত্যার গল্প’
বাদী রুনু বেগমের দাবি, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের নির্যাতন, অর্থের জন্য চাপ এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস, সোনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি জানান মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে মনিরকে তিনিই নিজ খরচে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে ফিরে এসে বিভিন্ন সময় লাখ লাখ টাকা নিয়েও তার মেয়েকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করেছে। তিনি তার একমাত্র সন্তান সোনিয়া হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি।
থানায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগ
আদালতে দেওয়া আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। পরে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে নিহতের মা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী মামলা দায়ের করেন। কিছুটা দেরিতে মামলা করার কারণ হিসেবেও এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নথিতে যা আছে
আদালতে দাখিল করা মামলায় মো. মনির হোসেনকে একমাত্র আসামি করা হয়েছে। মামলায় নিহতের মা রুনু বেগম বাদী হয়েছেন এবং নিহতের মামাসহ একাধিক ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দায়ের করা হয়েছে এবং বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন।
তদন্তের অপেক্ষায় প্রকৃত সত্য
আইনজীবীদের মতে, আদালতে মামলা দায়ের হওয়ায় এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হবে। তদন্ত শেষে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনে বর্ণিত হত্যার অভিযোগগুলো মামলার বাদীর আদালতে দাখিল করা অভিযোগের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে আসামির বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি এবং বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।