
বাংলাদেশ রেলওয়ের এক নারী কর্মীর ধারাবাহিক অভিযোগে উঠে এসেছে সরকারি কোয়ার্টার দখল, দীর্ঘদিনের কর্মস্থল নির্যাতন, বেতন-ভাতা বঞ্চনা, যৌন হয়রানি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার বিস্তৃত চিত্র। গত ১১ বছর ধরে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ার দাবি করেছেন তিনি।
ভুক্তভোগী হামিদা আক্তার শিল্পী বাংলাদেশ রেলওয়ের একজন স্থায়ী কর্মচারী। তিনি বর্তমানে বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের অধীনে এসএস কার্পেন্টার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ, কিন্তু দখল বুঝে পাননি
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ মার্চ তেজগাঁও রেলওয়ে কলোনির এল/৪৩ (ডি) নম্বর সরকারি কোয়ার্টার তার নামে বরাদ্দ হয়। তবে বরাদ্দ পাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত তিনি সেখানে বসবাস করতে পারেননি। উল্টো মাসের পর মাস তার বেতন থেকে নিয়মিত বাসাভাড়া কেটে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কয়েকজন রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ওই কোয়ার্টার দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রাজনৈতিক প্রভাব
অভিযোগপত্রে কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক কর্মী, রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বহিরাগত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি বাসা দখল, মাসোহারা আদায়, চাঁদাবাজি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ে কলোনিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসছে।
যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের বিষয়টি। হামিদা আক্তার শিল্পীর দাবি, চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাকে কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাজি না হলে অফিস ও কর্মস্থলের বাইরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাকে অজ্ঞান করে আপত্তিকর ছবি ধারণ করা হয় এবং পরে সেগুলো দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন।
বেতন-ভাতা বন্ধ, হাজিরা খাতায় স্বাক্ষরে বাধা
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় তাকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে দেওয়া হয়নি। কয়েক মাস বিনা বেতনে কাজ করানো হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে বিভিন্ন সময় বেতন-ভাতা, ওভারটাইম বিল, ছুটি, পদোন্নতি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে।
তার দাবি, বর্তমানে তিনি চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার ব্যয়ও বহন করতে পারছেন না।
চাঁদাবাজির অভিযোগে নতুন রাজনৈতিক নাম
২০২৫ সালের এপ্রিলে একটি অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেন, কোয়ার্টার উদ্ধারের নামে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছে কয়েক লাখ টাকা দাবি করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, একটি রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি কোয়ার্টার উদ্ধারের আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
রেলওয়ে কলোনিতে ‘অবৈধ সিন্ডিকেট’?
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, তেজগাঁও রেলওয়ে কলোনিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, সরকারি কোয়ার্টার জোরপূর্বক দখল করা। কোয়ার্টার ভাড়া দিয়ে অর্থ উপার্জন। মাসোহারা আদায়। সরকারি জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণ। মাদক ব্যবসা ও সেবনের সুযোগ সৃষ্টি। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।
একাধিক দপ্তরে অভিযোগ, তবু ব্যবস্থা নেই
ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলীর কার্যালয়, তেজগাঁও থানা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার লিখিত আবেদন করেছেন।
তার দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও কার্যকর তদন্ত কিংবা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা?
এই প্রতিবেদনের জন্য যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলো সম্পর্কে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সংগ্রহের চেষ্টা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ে, রেলপথ মন্ত্রণালয়, পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য নেওয়াও জরুরি।
প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি কেবল একজন কর্মীর ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়; বরং সরকারি সম্পদ দখল, কর্মস্থলে হয়রানি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, অভিযোগগুলোর প্রমাণ যাচাই, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান, সরকারি কোয়ার্টারের দখল পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
কারণ, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী যদি বছরের পর বছর অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার না পান, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।
যেহেতু বেশিরভাগ তথ্য অভিযোগপত্র, আবেদন ও ব্যক্তিগত দাবির ওপর ভিত্তি করে, তাই প্রতিবেদনে সেগুলোকে ‘অভিযোগ’, ‘দাবি’ ও ‘নথিতে উল্লেখ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।