প্রকাশ্যে হামলা, পরে দুঃখ প্রকাশ ও তদন্ত কমিটি গঠন
‘দোসর’ তকমা দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা জামায়াতের
ছাত্রদলের প্রতিবাদ ও নিন্দা
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৯:১৩ পিএম

রাজধানীর ধানমন্ডি-৩২ এলাকায় কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় আবারও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এক সাংবাদিককে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর দলটির পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়াও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানালেও ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ কমেনি মোটেও।

জানা যায়, গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সম্ভাব্য কর্মসূচি ঠেকাতে ধানমন্ডি-৩২ নম্বর এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি বাড়ে। এ সময় জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা হামলার দলটির নেতা-কর্মীদের হামলার শিকারে পরিণত হন।

অনুসন্ধানে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, কর্মসূচি চলাকালে দলটির একাধিক বক্তার দীর্ঘ বক্তব্যে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছিলো। তখন সাংবাদিকরা মূল বক্তার বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য দলের উপস্থিত নেতাদের অনুরোধ জানান। এ নিয়েই উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এ সময় দৈনিক সকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশির প্রতিবাদ জানালে তাঁকে ঘিরে ফেলা হয়। পরিচয়পত্র দেখানোর আগেই তাঁকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয়। তাঁকে উদ্ধারে এগিয়ে আসা আরও কয়েকজন সংবাদকর্মীও হামলার মুখে পড়েন বলে অভিযোগে জানা যায়। নেতা-কর্মীদের হামলায় আহত সাংবাদিককে তাৎক্ষণিকভাবে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে বাসায় পাাঠিয়ে দেয়া হয়।

এদিকে, ঘটনার পর সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের ঝুঁকি বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের পরিচয় ও পেশাগত স্বাধীনতাকে যথাযথভাবে সম্মান না করার প্রবণতাও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিশ্লেষকদের মতে, কোনো সাংবাদিককে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা বা ‘দোসর’ আখ্যা দিয়ে হেনস্তা করা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য গুরুতর হুমকি। এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশকে আরও সংকুচিত করতে পারে।

সংঘটিত এই হামলার ঘটনার পর জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসেন এটিকে ‘ভুল-বোঝাবুঝিজনিত অনাকাঙ্খিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, এই হামলার ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ধানমন্ডি জোনের পরিচালক অধ্যাপক নুর নবী মানিকের নেতৃত্বাধীন কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বহিরাগত কেউ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে।

অপরদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্খিত, অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরণের বাধা বা সহিংসতা সমর্থনযোগ্য নয়। দলীয় কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

অপরদিকে, একই দিনে ধানমন্ডি-৩২ এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি এবং পুলিশ সদস্যদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন নামের এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ। তিনি নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে, সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করে ভিডিও ধারণের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের প্রতিবাদ

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির নেতারা বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

এ ঘটনায় যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে সেগুলো হল, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? মাঠপর্যায়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ‘রাজনৈতিক পরিচয়’ দিয়ে চিহ্নিত করার প্রবণতা কেন বাড়ছে? দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তব সক্ষমতা কতটুকু? তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে? রাজনৈতিক মেরুকরণের এই পরিবেশে স্বাধীন সাংবাদিকতা কতটা সুরক্ষিত থাকবে?

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক কর্মসূচির ভেতরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পেশাগত নিরাপত্তার বর্তমান বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft