
শৈশবে যারা চরম দারিদ্র্য, অবহেলা কিংবা কোনো বড় ধরনের মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যান, প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে তাদের কোষের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এক ধরনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাময়িকভাবে এই পরিস্থিতি শরীরকে লড়াই করার বাড়তি শক্তি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা কোষকে দ্রুত বুড়িয়ে ফেলে এবং নানাবিধ মারাত্মক রোগব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
আমেরিকার বিখ্যাত জার্নাল ‘বায়োলজিক্যাল সাইকিয়াট্রি’-তে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবের প্রতিকূলতা মানুষের কোষের শক্তির উৎস বা ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’-র ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। যখন এই ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা বড় হয়ে কোনো মানসিক বা শারীরিক চাপের মুখোমুখি হন, তখন তাদের মাইটোকন্ড্রিয়া সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায় শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং দ্রুত শক্তি উৎপাদন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কোষের এই অতি-সক্রিয় অবস্থাকে বলা হচ্ছে ‘হাইপারমেটাবলিজম’।
ক্ষণস্থায়ী লাভ, দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি
গবেষকদের মতে, তীব্র সংকটের মুহূর্তে তাৎক্ষণিকভাবে শরীরকে টিকিয়ে রাখতে বা মানিয়ে নিতে এই বাড়তি শক্তি সাহায্য করে। কিন্তু সমস্যা হলো, শৈশবের ট্রমার কারণে শরীরের এই মেকানিজম স্থায়ী রূপ নেয়। ফলে কোনো চাপ বা বিপদ না থাকলেও কোষগুলো প্রতিনিয়ত এমনভাবে কাজ করতে থাকে যেন তারা এখনো কোনো বড় বিপদের মধ্যে আছে।
যুক্তরাজ্যের ইউসিএলএ-এর মনোবিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক জেনিফার সামনার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মাইটোকন্ড্রিয়া যদি বিশ্রামের সময়েও অবিরাম চাপের মধ্যে কাজ করতে থাকে, তবে তা খুব দ্রুত কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে কোষের ভেতরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং একটা সময় পর সামগ্রিক কার্যক্রম একদম কমে যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’
আঘাত ও বঞ্চনার ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব
গবেষণার প্রথম লেখক শাইলো ক্লিভল্যান্ড জানান, এই প্রথম কোনো গবেষণায় বৈচিত্র্যময় প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের ওপর শৈশবের দুই ধরনের নেতিবাচক প্রভাব-‘হুমকি’ এবং ‘বঞ্চনা’-কে আলাদা করে কোষের ওপর তাদের প্রভাব দেখা হয়েছে।
হুমকি (যেমন- সহিংসতা বা মানসিক ট্রমা): এটি কোষের তাৎক্ষণিক শক্তি উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তবে ভবিষ্যতে আসতে পারে এমন যেকোনো মানসিক বা শারীরিক চাপ মোকাবিলার জন্য কোষকে সবসময় যুদ্ধংদেহী অবস্থায় প্রস্তুত রাখে।
বঞ্চনা (যেমন- অবহেলা বা চরম দারিদ্র্য): এটি কোষের ভেতর অত্যন্ত অদক্ষ ও ত্রুটিপূর্ণ উপায়ে শক্তি উৎপাদন বাড়ায়, যা মূলত কোষের অভ্যন্তরীণ বিকলতার অন্যতম লক্ষণ।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষকদের মতে, শৈশবের দারিদ্র্য ও ট্রমা কীভাবে পরবর্তী জীবনে একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়, তার জীববৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচনে এই গবেষণা এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
শৈশবের এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলো কোষের স্তরে কীভাবে প্রভাব ফেলছে তা আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হলে, বয়সজনিত জটিল রোগগুলো শরীরে বাসা বাঁধার আগেই উপযুক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে মানুষকে সুস্থ রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। সূত্র: এনডিটিভি
জ/উ