
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা নতুন সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান গেটওয়ে হলো দেশটির উত্তর-পশ্চিমের শিনজিয়াং প্রদেশ। উরুমচি শহরের আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর ও ২১টি রেল সংযোগের মাধ্যমে এটি মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সাথে বাণিজ্য বাড়াচ্ছে, যা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের প্রকল্পের কেন্দ্রস্থল। আর এ প্রকল্পে মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়াং এর উরুমচি এবং কাশগর শহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের একটি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। সফরকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সাংহাইয়ের পাশাপাশি শিনজিয়াং প্রদেশের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং সরেজমিনে অঞ্চলটির উন্নয়ন কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে চীন, পশ্চিম এশিয়ায় তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতে এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। নতুন সিল্ক রোডের গেটওয়ে হতে চলেছে চীনের পশ্চিমের প্রদেশ শিনজিয়াং। প্রাচীন পথটিকে পুনরুদ্ধারে উরুমচি শহরে প্রায় ৬৫ বর্গ কিলোমিটারের বেশি এলাকা জুড়ে চালু হওয়া আন্তর্জাতিক স্থলবন্দরটি ২১টি রেলপথ সংযোগের মাধ্যমে ১৯টি দেশের সঙ্গে যুক্ত। গত বছর এই রেলপথ দিয়ে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।
উরুমচির এই রেলসংযোগ ছাড়াও শিনজিয়াংয়ের আরেক ঐতিহাসিক শহর কাশগর থেকে অপর একটি রেলপথে উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার ৫টি দেশে বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল করে। চীন বলছে, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন এক সম্ভাবনা দ্বার সৃষ্টি করবে। তারই দৃষ্টান্ত এই অবকাঠামো। স্থলবন্দরের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, টেক্সটাইল জোন প্রতিষ্ঠা করে এক সময়ের অবহেলিত ও মরুময় উরুমচিকে মহাদেশীয় বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে।
দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, উত্তর-পশ্চিম চীনের শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মধ্য তিয়ানশান পর্বতমালা ভেদ করে নির্মিত তিয়ানশান শেংলি টানেলটি কয়েক ঘণ্টার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি যাত্রাকে কমিয়ে মাত্র ২০ মিনিটে এনেছে। ২২ দশমিক ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি টানেল উন্মুক্ত করা হয়ছে। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ টানেল বলে দাবি করেছে বেইজিং।
শিনজিয়াংয়ের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থানীয় অবকাঠামো উন্নত করছে এবং পর্যটন বৃদ্ধির মাধ্যমে (২০২৫ সালে ৩২৩ মিলিয়নের বেশি ভিজিটর) অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই পথটি চীনকে কাজাখস্তান, রাশিয়া এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলির সাথে সংযুক্ত করে ইউরোপে যাওয়ার একটি নতুন বিকল্প তৈরি করেছে।
ফলে শিনজিয়াং এখন কেবল একটি সীমান্ত প্রদেশ নয়, বরং চীনের পশ্চিম দিকে দরজা খোলার মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি নতুন হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মুসলিম উইঘুর জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত শিনজিয়াং বা সাবেক পুর্ব তুর্কিস্থান স্ব^ায়ত্বশাসিত অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবে সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল এবং বর্তমানে এটি ইউরেশীয় মহাদেশের হৃদপিণ্ডে অবস্থিত, যা চীনকে পশ্চিমের সাথে সংযুক্ত করে। শিনজিয়াং প্রদেশের উরুমচিতে স্থলবন্দরটি ২০১৫ সালে কার্যক্রম শুরু করে। এই নতুন রুটের মাধ্যমে চীন থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহন দ্রুত ও সাশ্রয়ী হয়েছে। শিনজিয়াংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। শিনজিয়াং অঞ্চলকে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এখানে বর্তমানে পাওয়ার প্রকল্প, কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রকল্প স্থপিত হচ্ছে।
২০২৫ সালে শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর পূর্ণ হয়েছে। শিনজিয়াং প্রদেশের রাজধানী উরুমচি শহরকে বর্তমানে পুরোপুরি আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে শহর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। শহরের বাসিন্দাদের জন্য চালু করা হয়েছে বিশেষ একটি মোবাইল অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা নিজেদের যেকোনো সমস্যা জানালে কর্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ে তা সমাধানে উদ্যোগ নেয়। একসময়ের পিছিয়ে পড়া এই প্রদেশ এখন অত্যাধুনিক অবকাঠামো, কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, স্মার্ট শহর ব্যবস্থাপনা এবং বিপুল পর্যটকের সমাগমে মুখর হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি স্থানীয়দের জীবনযাত্রার মানেরও ব্যাপক উন্নয়ন দৃশ্যমান।
শিনজিয়াং অঞ্চলে কৃষিপণ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। কম সময়ে অধিক ফসল ফলানোর নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শিনজিয়াংয়ের একটি আধুনিক গ্রিনহাউজ ফ্যাক্টরি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে নানা ধরনের শাকসবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। সারা বছরই এ উৎপাদন অব্যাহত থাকে। শিনজিয়াং অঞ্চলে ফসল উৎপাদনে এখন ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। চীনা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে একসময় শিনজিয়াং অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা ছিল। তবে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। চীনা গাইড ওয়েং জানান, সরকারের কঠোর পদক্ষেপ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হওয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা এখন আর আগের মতো নেই। প্রদেশটিতে এখন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে।
নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়ায় শিনজিয়াংয়ে প্রতি বছর পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ৩২ কোটি ৩০ লাখ (৩২৩ মিলিয়ন) পর্যটক শিনজিয়াং ভ্রমণ করেছেন। এ খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৩৭০ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৫৩.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। ২০২৬ সালে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে শিনজিয়াংয়ের দর্শনীয় স্থানগুলোর আধুনিকায়ন ও নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
যদিও শিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মুসলিম ও পশ্চিমা বিশ্বে উদ্বেগ রয়েছে। পশ্চিমা মিডিয়াগুলোতে এ নিয়ে প্রায়ই নানা খবর প্রচার হয়। তবে, একে ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি করেছেন শিনজিয়াং প্রদেশের ইসলামিক সেন্টারের প্রধান ইমাম ও চাইনিজ মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ ইয়াহিয়া।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতের তিনি বলেন, শিনজিয়াংয়ের মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া যে অপপ্রচার চালিয়ে থাকে, তা আদৌ সত্য নয়। এখানে ধর্ম পালনে কোনো বাধা নেই। যারা এসব অপতথ্য ছড়ায় প্রকৃত সত্য জানতে আমরা তাদেরও এখানে এসে পরিস্থিতি দেখে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
প্রসঙ্গত, মধ্য এশিয়া হয়ে ইউরোপে চীনের রেশম বয়ে নিয়ে যেতো উটের কাফেলা, পাড়ি দিতো মরুভূমির পথ। পরে সেই রেশম থেকেই বাণিজ্যিক এই পথটির নাম হয় সিল্ক রোড। সময়টা প্রায় দুই হাজার বছর আগে, চীনের হান সাম্রাজ্যের আমলে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া সেই পথই পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট চীন।
উরুমচি হয়ে পাকিস্তান ও চীনের সীমান্তটি কারাকোরাম পর্বতমালায় অবস্থিত ৫৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সুরক্ষিত পাহাড়ি সীমান্ত। এটি পাকিস্তানের গিলগিট-বালটিস্তান অঞ্চলের সাথে চীনের শিনজিয়াং প্রদেশকে যুক্ত করেছে। পাকিস্তানের দিকের খুঞ্জেরাব পাস হলো এই সীমান্তের একমাত্র উন্মুক্ত স্থলবন্দর ও প্রধান ক্রসিং পয়েন্ট। এটি ১৫,৪৩৯ ফুট (৪,৬৯৩ মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পাকা আন্তর্জাতিক সীমান্ত-ক্রসিং। চীন ও পাকিস্তানকে সংযুক্তকারী ঐতিহাসিক মহাসড়কটি কারাকোরাম হাইওয়ে বা ফ্রেন্ডশিপ হাইওয়ে নামে পরিচিত। এটি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রুট। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে সারা বছর ধরে বাণিজ্য ও পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শীতকালে মাঝে মাঝে চরম আবহাওয়ার কারণে সাময়িক সময়ের জন্য সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
এছাড়া ইরানের মাধ্যমে চীনের পশ্চিম এশিয়ার সাথে সংযোগের জন্য দুটি প্রধান পথের প্রথমটি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর এবং দ্বিতীয়টি আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোর। চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরটি পাকিস্তানের গোয়াদর ও করাচি বন্দর থেকে শুরু হয়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এটি চীনের জন্য পশ্চিম এশিয়ায় প্রবেশের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। এটি ইরানের চবাহার বন্দরের সাথে কার্যকর পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোরও চীনের পশ্চিম এশিয়ার সাথে সংযোগের আরেকটি কৌশলগত পথ। এর বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, এই করিডোর চীনকে মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
এই দুই করিডোর মালাক্কা প্রণালীর উপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি, চীনকে ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে পশ্চিম এশিয়া এমনকি ইউরোপ পর্যন্ত সংযোগ গড়ে তোলার সুযোগ দিচ্ছে। উল্লেখ, চীনের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রপথে বাণিজ্য মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল- যা মার্কিন প্রভাবাধীন- এ কারণে স্থলপথের বিকল্প একটি কৌশলগত নিরাপত্তা পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।