বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র সাংহাই। ইতিহাসের পরিক্রমায় গড়ে উঠেছে এই শহর। যার রয়েছে একইসাথে ইউরোপীয় এবং এশিয়ান ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। একইসাথে এই শহর চীনা কমিউনিস্ট আন্দোলনেরও ঐতিহাসিক পথচলার স্বাক্ষী। সাংহাই শহর আধুনিক নগর স্থাপত্যেরও চমৎকার উদাহরণ।
চীনের তানিয়াং-খুনশান সেতু বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু। এটির দৈর্ঘ্য ১৬৪.৮ কিলোমিটার। তানিয়াং-খুনশান সেতু চীনের সবচেয়ে বড় শহর ও বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র সাংহাই ও পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশের নানচিং শহরকে যুক্ত করেছে।
২০১১ সালের ৩০ জুন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সেতু তানিয়াং-খুনশান উদ্বোধন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় চীন। দেশটির সবচেয়ে বড় শহর সাংহাই ও জিয়াংসু প্রদেশের নানচিং শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৮৫০ কোটি ডলার। এই সেতু নির্মাণে কাজ করে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক। তানিয়াং-খুনশান নির্মাণে সময় লাগে চার বছর। খরচ হয় সাড়ে ৮০০ কোটি ডলার। তানিয়াং-খুনশান সেতুর রয়েছে দুই হাজার পিলার। এই বিশাল সেতু নির্মাণে ব্যবহার করা হয় সাড়ে চার লাখ টন স্টিল, যা এটিকে অনেক বেশি মজবুত করে। মজবুত হওয়ায় টাইফুন, রিখটার স্কেলে আট মাত্রার ভূমিকম্পসহ বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ তানিয়াং-খুনশান সেতুর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। এমনকি তিন লাখ টন ওজনের নৌযান চলাচল করলে যে প্রভাব পড়ে নদীতে, তাও সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে সেতুটির। তানিয়াং-খুনশান সেতুতে রয়েছে পেইচিং-সাংহাই হাই স্পিড রেলপথ। যেহেতু এই সেতুর ওপর দিয়ে উচ্চ গতির ট্রেন চলাচল করে, তাই এটির নকশাও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে করেন প্রকৌশলীরা। সেতুর ওপর দিয়ে সর্বোচ্চ ঘণ্টায় আড়াইশ কিলোমিটার থেকে সাড়ে তিনশ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারে। অবশ্য ব্যস্ত সময়ে এই সেতু দিয়ে ঘণ্টায় ৩৮০ কিলোমিটার গতিতেও ট্রেন চলাচল করে।
সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল চূড়ান্ত
চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) বিশ্বের এই দীর্ঘতম সেতুর নকশা করে। সিআরবিসি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় সিআরবিসির প্রায় ৬০টি কার্যালয় রয়েছে। মূলত সেতু, হাইওয়ে, টানেল, বন্দর নির্মাণ করে থাকে এই কোম্পানি। কেবল তানিয়াং-খুনশান সেতুই নয়, সিআরবিসির বেশিরভাগ প্রকল্প সম্মানজনক পুরস্কার লাভের পাশাপাশি রেকর্ডও গড়ে। ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সুরামাদু সেতু নির্মাণ করে সিআরবিসি। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স পুরকৌশলে অসামান্য অবদান রাখার জন্য সিআরবিসিকে সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করে।
সাংহাই মেগাসিটি হলেও এটি প্রদেশের সমমর্যাদাবিশিষ্ট ও সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারশাসিত চারটি পৌরসভার একটি। মূল শহরের জনসংখ্যার বিচারে এটি কেবল চীন নয়, সমগ্র বিশ্বের বৃহত্তম শহর। এর জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটি। সাংহাই চীনের আর্থ-বাণিজ্যিক খাতের কেন্দ্রবিন্দু, অন্যতম বৃহৎ শিল্পোৎপাদন কেন্দ্র ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর। এটি সমগ্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান আর্থ-বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং জাহাজের মালামালের বাক্স তথা কন্টেইনারের হিসেবে বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর। এছাড়া বর্তমানে উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও এটি চীনের অন্যতম অগ্রগণ্য কেন্দ্র।
সাংহাই শব্দটির অর্থ “সাগরের উপরে”। শহরটি ছাং চিয়াং নদীর একটি উপনদী হুয়াংফু নদীর তীরে অবস্থিত। এই বন্দর শহরটি ইয়াংসে নদীর অববাহিকাতে মূল প্রবেশপথ। হুয়াংফু নদীর বদৌলতে মহাসমুদ্রগামী জাহাজগুলি এর বন্দরে ভিড়তে পারে।
সাংহাই বহু শতাব্দী ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, নৌপরিবহন ও বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। ১৯ শতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের জয়লাভের পর যে ৫টি চীনা বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করতে বাধ্য করা হয়, তাদের মধ্যে সাংহাই ছিল একটি। ১৮৪৪ সালে আরেকটি চুক্তি একটি ফরাসি-শাসিত ছিটমহলও প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর থেকে শহরটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনকারী একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে থাকে এবং চীনদেশের অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে। ১৯২১ সালে এখানে চীনা সাম্যবাদী দল প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৩০-এর দশকে এসে সাংহাই এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৩৭-৪৫ সালে চীনা-জাপানি যুদ্ধের সময় এখানে গুরুতর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা শহরটি দখল করে। কিন্তু ১৯৪৯ সালে চীনা সাম্যবাদী দল চীনের মূল ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ দখল করার পর সাংহাইয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে বন্দরটি আন্তর্জাতিক প্রভাব বহুল হ্রাস পায়। ১৯৯০-এর দশকে এসে প্রধানমন্ত্রী দেং জিয়াও পিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারগুলির ফলস্বরূপ সাংহাইয়ে পুনরায় জোরদার উন্নয়নকাজ আরম্ভ হয়।
সাংহাইয়ে পর্যটকদের জন্য অনেক আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে। দ্য বুন্ড নামের নদীতীরস্থ পথচারীদের হাঁটার রাস্তার উপরে উপনিবেশ আমলের বিভিন্ন ভবন সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর অপর তীরে শহরের ফুতুং এলাকার সুউচ্চ আধুনিক অট্টালিকার সারিগুলি লুচিয়াৎসুই দিগন্ত রূপরেখাটি গঠন করেছে, যাকে মূল চীনা ভূখণ্ডের উদীয়মান অর্থনীতির একটি প্রদর্শনী হিসেবে গণ্য করা হয়। এদের মধ্যে ৬৩২ মিটার উঁচু সাংহাই টাওয়ার এবং ওরিয়েন্টাল পার্ল টেলিভিশন টাওয়ার চোখে পড়ার মত। পর্যটকরা টেলিভিশন টাওয়ার এ আরোহন করে এবং সেখান থেকে পুরো শহর দৃশ্যমান হয়। কফি পানের রেস্তোরায় ভরপুর শহরটি। এখানে প্রায় ১০ হাজরের মতো কফি শপ রয়েছে।
সাংহাই আরবান প্লানিং সেন্টারের মাধ্যমে শহরটির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ চলমান।
মজার বিষয় হলো, এতো বিশাল জনসংখ্যার শহর হলেও এখানে তেমন মানুষজন দেখা যায় না। কারণ এই মেগাশহরের মানুষরা অধিকাংশই শহরের পাতাল মেট্রোরেলের মাধ্যমেই বেশী চলাচল করে।