
চীনে সরকারের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তারপরও মুসলমানরা মূল সমাজ থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখে। আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যুক্তরা নিজেদেরকে সরকারী কার্যক্রম থেকে সরিয়ে রাখে। তবে হালাল খাবার এবং অর্থনীতির অংশ উইঘুর মুসলমানরা। দিন দিন মূল চীনা সমাজেও মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটছে।
বর্তমানে সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়ে চীনের ইসলামিক সংস্থা পুরো জাতির নিকট চীনা মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে। ১৯৫৩ সালের ১১মে সংস্থাটির উদ্বোধনী সভায় গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ১০টি ভিন্ন জাতীয়তার অধিকারী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংস্থাটি ১৬জন ধর্মীয় নেতা দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা যারা ইসলামিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশাসনের সঠিক ও কর্তৃত্বমূলক ব্যাখ্যা করবে। মূলত অনুপ্রেরণামূলক রচনা ও বক্তব্য প্রচার, ইমামদের উন্নতিসাধনে সাহায্য করা এবং দেশটিতে ইমামদের প্রদানকৃত বক্তৃতা যাচাই করাই সংস্থাটির উদ্দেশ্য।
বর্তমানে চীনা সরকার মুসলিমদের চীনের মুলধারার সমাজের সাথে একাত্ন করতে কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। তার মধ্যে রয়ে মুসলিম সম্প্রদায় আলাদা কবরস্থান বানাতে পারবে। মুসলিম দম্পত্তি ইমামের মধ্যস্থতায় বিয়ে করতে পারবে। মুসলিম শ্রমিকরা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন ছুটি পাবে। হজ করতে মক্কায় যেতে পারবে। এক হিসেবে গত কয়েক বছরে ৪৫,০০০ এর চেয়েও বেশি চীনা মুসলিম পবিত্র হজব্রত পালন করেছে।
উন্নয়নের জন্য কঠোর পরিশ্রমে জোর দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং। তার নির্দেশনায় উইঘুর মুসলমানদের জন্য বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে শিনজিয়াং-এ। সেখানে মুসলমান উইঘুরদের পাশাপাশি চীনা সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনা করছে। ফলে মূল চীনা সমাজের সাথে মুসলমানদের একটা সখ্যতা তৈরী হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে সফরে আসা সাংবাদিক প্রতিনিধিদলকে নিয়ে যাওয়া হয় সাংহাই শহরের উপকন্ঠে একটি মসজিদে। মসজিদটির ইমাম জানালেন, জুমার দিনে মসজিদটিতে দেড়-দুইশ মুসল্লী নামাজ পড়তে আসেন। তবে সিংহভাগই বিদেশী। তিনি জানান, মসজিদ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যুক্ত মুসলমনরা সাধারণত ব্যবসায়ী শ্রেণীর। তারা খুব একটা সরকারী কার্যক্রমে যুক্ত নন।
এরপর শিনজিয়াং-এর রাজধানী উরুমচি সফরকালে নিয়ে আসা হয় শিনজিয়াং ইসলামিক সেন্টার এ। এখানকার রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ইনস্টিটিউটে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, আরবি ভাষা, কোরআন-হাদিস এবং শরিয়াহভিত্তিক আইন বিষয়ে পাঠদান করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়ে নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করার পর মসজিদের ইমাম, ধর্মীয় শিক্ষক কিংবা সংশ্লিষ্ট পেশায় যুক্ত হন। বর্তমানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন এবং তাদের জন্য তিনটি আবাসিক ডরমিটরি রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ইমাম মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, আমরা এখানে এমন একটি শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছি যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান ও আধুনিক সমাজব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটানো হয়। শিক্ষার্থীরা শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনই নয়, বরং সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্যও প্রস্তুত হয়। তিনি আরও বলেন, এই ইনস্টিটিউট সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
ইনস্টিটিউটটিতে মোট ৬২ জন শিক্ষক পাঠদান ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত। অবকাঠামোগত সুবিধার দিক থেকেও এটি সমৃদ্ধ। এখানে একটি লাইব্রেরিতে প্রায় ১৭ হাজার বই রয়েছে, যা স্থানীয় উইঘুর, ম্যান্ডারিন ও আরবি ভাষা থেকে অনূদিত। পাশাপাশি একটি আধুনিক ই-লার্নিং সেন্টার শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করছে। তিন বছর ও চার বছর মেয়াদি কোর্সের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছে।
জানা গেছে, অতীতের উগ্রপন্থা ও বিচ্ছিন্নতাবাদের ঝুঁকি মোকাবিলায় ধর্মীয় শিক্ষা ও কার্যক্রমকে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার মধ্যে আনা হয়েছে। ইয়াহিয়া বলেন, ধর্মীয় শিক্ষাকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার মাধ্যমে আমরা তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারছি। তবে আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ এই ব্যবস্থাকে সমালোচনার চোখে দেখে।
এছাড়াও সাংবাদিক প্রতিনিধিদলকে নিয়ে যাওয়া হয় উরুমচি শহরের গ্র্যান্ড মস্ক (মসজিদ) পরিদর্শনে। এখানে প্রাচীন মসজিদটির মিনার শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। কিন্তু মসজিদটি এখন পুরাকীর্তির অংশ।
তবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে শিনজিয়াং-এর স্থিতিশীলতা চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চীনে হালাল খাবার এবং অর্থনীতির অংশ উইঘুর মুসলমানরা-
চীনে হালাল খাবারের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। থাং ও সুং সাম্রাজ্যের শাসনামলে আরব ও পারসিক ব্যবসায়ীদের আবির্ভাবের মাধ্যমে চীনে মুসলিম খাদ্যাভাসের পরিচয় ঘটে। চীনা মুসলিম রন্ধনপ্রণালীতে ভেড়ার মাংস অন্যতম প্রধান খাবার। চীনের মুসলিম রন্ধনপ্রণালী অল্প আঁচে রান্না, ভাপে রান্না, সিদ্ধ করা ও ভাজার মত চীনা রন্ধনশৈলীর অনেক পদ্ধতি গ্রহণ করায় মুসলিম রন্ধনপ্রণালী বেশ উন্নত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। চীনের বহু-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রদেশভেদে মুসলিম রন্ধনপ্রণালীর নিজস্ব রূপ রয়েছে।
চীনের উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। যদিও শিনজিয়াংয়ের সবচেয়ে বড় এই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠির সদস্যরা এখন চীনের বৃহত্তর অর্থনীতির কার্যকর অংশ। এক সময়ে পিছিয়ে পড়া এই অঞ্চলে এখন সুউচ্চ ভবন আর উন্নয়নের ছোঁয়া। যেখানে সমানতালে অংশ নিচ্ছেন শিনজিয়াংয়ের মুসলমানরা। ঐতিহাসিকভাবে বারবার হোঁচট খাওয়া উইঘুরের এই মুসলমানরাই নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সমান তালে। যে কোন চীনা শহরে পর্যটকরা উইঘুর হালাল রেস্টেুরেন্টগুলোতে ভীড় জমায় এবং এই রেস্টেুরেন্টগুলো এখন মুসলমানদের অর্থনীতির একটি নতুন ধারা।
প্রসঙ্গত, প্রায় ১৪০০ বছর ধরে চীনা সমাজে ইসলাম ধর্ম পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে মুসলিমরা চীনের একটি অন্যতম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। সরকারী হিসেবে, চীনের মোট জনসংখ্যার ১ থেকে ৩% ইসলাম ধর্মাবলম্বী, মানে প্রায় ২ থেকে ৪ কোটি মুসলমান রয়েছে চীনে। হুইরা চীনের বৃহত্তম মুসলিম গোষ্ঠী ও সাধারণত ম্যান্ডারিনভাষী আর উইঘুররা শিনচিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বসবাসকারী তুর্কিভাষী জনগোষ্ঠী। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কাজাখ, কিরগিজ, তাজিক এবং দংজিয়াং মুসলমান রয়েছে। সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিংশিয়া, কানসু ও ছিংহাই প্রদেশেও উল্লেখযোগ্য মুসলমান বাস করে। ৭ম থেকে ১০ম শতক পর্যন্ত যুদ্ধ, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক বিনিময়ের মাধ্যমে উপকূলবর্তী এলাকা ও স্থলপথের মধ্যে রেশম পথে ধীরে ধীরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে চীনজুড়ে।
চীনা মুসলিমদের ঐতিহ্যগত কিংবদন্তি অনুসারে, ৬১৬-১৮ খ্রিষ্টাব্দে নবী মুহাম্মদ(সা.) এর সাহাবা সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সাঈদ, ওয়াহাব ইবনে কাবছা এবং আরও একজন সাহাবা চীনকে ইসলাম ধর্মের সাথে পরিচিত করে তোলেন। ওয়াহাব আবু কাবছা ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে সাগরপথে গোয়াংজো (ক্যান্টন) পৌঁছান বলে অনেকে মত প্রকাশ করে থাকেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) এর সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস হুয়াইশেং মসজিদ নির্মাণ করেন। এ শহরেই তার মাজার রয়েছে। গোয়াংজো শহরে আসা বিদেশী মুসলিম পর্যটকদের কাছে এ সাহাবীর মাজার অন্যতম আকর্ষণ। অনেকেই তার মাজার জিয়ারতে আসেন।
১৯৩৯ সালে উত্তর-পশ্চিম চীনের চীনা মুসলিম যোদ্ধারা জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শন করেন। এসময় অনেক চীনা মুসলিম পরিবার জাপানীদের নির্যাতনের শিকার হয়। বহু মুসলিম যোদ্ধাদের ও তার পরিবারের সদস্যদের জাপানিরা নানচিংয়ে হত্যা ও ধর্ষণ করে। পরে কিং সাম্রাজ্যের পতনের পর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা সান ইয়াত-সেন ঘোষণা করেন যে হান, মান (মানচু), মেং (মঙ্গোল) ও হুই (মুসলিম) জাতি সমানভাবে চীনের দাবিদার।
কুওমিনতাং দলের শাসনামলে দলটি মা ক্লিক নামক পরিবারের মুসলিম সেনাপতিদের কিংহাই, গানসু এবং নিনজিয়া প্রদেশের সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করে। ঐ আমলে বাই চংজি একজন মুসলিম জেনারেল ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন।
দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধ চলাকালে জাপানিরা ২২০টি মসজিদ ধ্বংস করে এবং ১৯৪১ সালের এপ্রিলের মধ্যে অগণিত হুই জনগোষ্ঠীর মানুষকে হত্যা করে। হুই মুসলিমদের প্রদেশ দাচাং জাপানিদের হত্যাকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায়। নানকিংয়ের ধর্ষণের সময় নানজিংয়ের মসজিদগুলো জাপানি হত্যাকাণ্ডের পর লাশে সয়লাব হয়ে যায়।
চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়ও মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হন। মসজিদ বন্ধ ও ধ্বংস করা হয়, কুরআনের অনুলিপি নষ্ট করা হয় এবং কবরস্থান ধ্বংস হয়। ফলে ১৯৭৫ সালে হুই মুসলিমদের মধ্যে বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়, যা ছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিরুদ্ধে সংঘটিত একমাত্র শক্তিশালী জাতিগত বিদ্রোহ। এ বিদ্রোহ দমন করতে পিএলএ বিভিন্ন গ্রামে মিগ ফাইটার বিমান ব্যবহার করে রকেট বর্ষণ করে ১৬০০ হুয়েইকে হত্যা করে। পরে ১৯৭৮ সালে, সরকার মুসলমানদের প্রতি তার নীতি শিথিল করতে শুরু করে।