চীনা গণমাধ্যমগুলো দেশটির তৃণমূলের খবর তুলে ধরে
দেশের ভেতরে-বাইরে চীনা কমিউনিটির ৩০ কোটিরও বেশী দর্শক ও পাঠক রয়েছে ‘দ্য পেপার’ এর
আহমদ আতিক, চীন থেকে ফিরে
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৭:১৭ পিএম

চীনা গণমাধ্যমগুলো দেশটির তৃণমূলের খবর তুলে ধরে। সেই সাথে সমাজের পরিবর্তনের দিক নির্দেশনা দেয়। মোট কথা সরকার ও রাষ্ট্রের স্বার্থ বজায় রেখে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। একদিকে রাষ্ট্রীয় নীতি মেনে চলতে হয়, অন্যদিকে দেশের জনগণের স্বার্থও রক্ষা করতে হয়। এভাবেই বাংলাদেশী সাংবাদিকদের চীনা গণমাধ্যমের নানা দিক তুলে ধরছিলেন সাংহাই-ভিত্তিক গণমাধ্যম ‘দ্য পেপার’ -এর  সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য ও প্রকাশক উ তিং।

‘দ্য পেপার’ দেশের ভেতরে চীনের জনগণ ও বিদেশে চীনা কমিউনিটির এক ধরনের সংযোগ সাধন করছে। দৈনন্দিন ঘটনার খবরের পাশাপাশি প্রতিদিন তাদের ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ৩০০ আর্টিক্যাল প্রকাশ করে। তাদের দর্শক ও পাঠক ৩০ কোটিরও বেশি। 

চীন সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ থেকে আমরা ১৬ সদস্যবিশিষ্ট সাংবাদিক প্রতিনিধিদল এক সপ্তাহের চীন সফরে যাই। গত ২০ এপ্রিল সফরের প্রথম দিন বিকেলে সাংহাইয়ের একটি মিডিয়া অফিস দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সাংহাই ইউনাইটেড মিডিয়া গ্রুপের অধীন ‘দ্য পেপার’ নামের মিডিয়াটি একটি অনলাইন গণমাধ্যম। অর্থাৎ তাদের একটি ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট আছে। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির সাংবাদিকরা বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় করেন।

মতবিনিময়কালে দ্য পেপার’র সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য ও প্রকাশক উ তিং বলেন, আমরা গণমাধ্যমে যেমন রাষ্ট্রীয় নীতি মেনে চলি, একইসঙ্গে  জনআকাঙ্খা যেন পূরণ হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখি। সেই সাথে ভুল তথ্য এড়িয়ে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে হয় গণমাধ্যমে।  

উ তিং বলেন, চীনের গণমাধ্যম সংস্থাগুলোকে অবশ্যই আইন এবং কমিউনিস্ট পার্টির নীতি মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন ধরনের পাঠক/দর্শকের চাহিদা মেটাতেও সচেষ্ট থাকতে হয়।

পরিকল্পিত বসুন্ধরাকে বিশৃঙ্খল নগরে পরিণত করার শঙ্কা

পরিকল্পিত বসুন্ধরাকে বিশৃঙ্খল নগরে পরিণত করার শঙ্কা


তিনি আরও বলেন, ভুল তথ্যের ফাঁদ এড়াতে তাদের সব সময় অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। নির্ভুলতার অভাব থাকলে সেই সংবাদ এড়িয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যকার পার্থক্য থাকলেও উ তিং বলেন, যদিও উভয় দেশই ভিন্ন শাসন ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, তবুও জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-রাজনীতির মতো বৈশ্বিক বিষয়গুলোতে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

‘দ্য পেপার’ কীভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উ তিং বলেন, তথ্য সংগ্রহে বহুস্তরীয় পদ্ধতি রয়েছে। তবে সিনহুয়া নিউজ এজেন্সিকে একটি প্রাথমিক ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে,  তারা কোনো একটিমাত্র বিবরণের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভুলতা নিশ্চিতে সংস্থাটি এপি, রয়টার্স এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর ওপরও নজর রাখে। 

দ্য পেপারের এক নারী সাংবাদিক আমাদের প্রজেক্টরের মাধ্যমে ডিজিটাল উপস্থাপনা দিলেন। তার নাম ফেঙ্গ মেঙ্গ, দ্য পেপারের ফ্যাক্ট চেকিং টিমের সদস্য। তিনি বলেন, মিস ইনফরমেশন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ায় এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত। এ কারণে ২০২১ সালে তারা এই ফ্যাক্ট চেক ব্যবস্থা চালু করেন। তাদের উদ্দেশ্য, বড় বড় আন্তর্জাতিক ঘটনা চিহ্নিত করে সেগুলো যাচাই করা। পাশাপাশি, চীন সম্পর্কে ভুল তথ্য দিলে সেটা খুঁজে বের করা।

ফেঙ্গ মেঙ্গের ফ্যাক্ট চেক টিম স্টোরির ফরম্যাট মেলানোর কাজ করেন। তিনি বলেন, কখনো কখনো একটি ছোট ভিডিও অনেক বেশি কাজ করে। কোনো কোনো সময় বিস্তারিত রিপোর্টের প্রয়োজন হয়। চীনের বিশেষ দিক হলো, সেখানে ফেসবুক কিংবা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চলে না। চীনের নিজস্ব উইচ্যাট, সর্বত্র আছে। তবে ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম যেমন-টিকটক, ইউটিউব ও এক্সও তারা ব্যবহার করে থাকেন। গত সাড়ে চার বছরে তারা ৯ শতাধিক ফ্যাক্ট চেক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের এসব কনটেন্ট ৯০ কোটি মানুষের ভিউ হয়েছে। 

এ ক্ষেত্রে তিনি খুব সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ তুলে ধরেন। গত মাসে তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে অপতথ্য সক্রিয়ভাবে যাচাই করছিলেন। এই সময়ে একটি রটনা হলো যে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে হত্যা করা হয়েছে। কিংবা এমন ভিডিও ছড়ানো হয়েছে যেখানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারে আগুন দেওয়া হয়েছে। আমরা সরাসরি এসব ভিডিওকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেইনি। আমরা গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছি যে, এসব গুজব কোথা থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এসব বিষয়ে জনগণকে সত্যিকার প্রমাণ দেখিয়েছি। 

প্রযুক্তির নতুন উপাদান আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তথা এআইকে ফেঙ্গ বর্ণনা করেন ‘রুমের ভেতর হাতি’ হিসেবে। এআই সবকিছুকে পাল্টে দিচ্ছে। এটা ফ্যাক্ট চেকারদের কাজটাকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। দ্য পেপারে সাংবাদিকরা এআই কীভাবে সংবাদকে প্রভাবিত করছে, সেটাও দেখেন। আমরা অধিক থেকে অধিকতর এআই সৃষ্ট মিথ্যা দেখছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটা চীনা জাহাজ থেকে মিয়ানমারের ভূমিকম্প এলাকায় আবর্জনা ফেলছে। এসবই এআই সৃষ্ট গুজব রটনা, যা রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে।

তিনি বলেন, তারা চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও ডিপসিকের মডেল পরীক্ষা করছেন। তারা জানার চেষ্টা করছেন যে, তাদের শেষ কোথায়। তারা কি দ্রুততম সময়ে ফ্যাক্ট চেককে সহায়তা করছে? তারা কীভাবে সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছে, কোনটা সত্যি।

বিশ্বের এই মুহূর্তে মিডিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ হলো সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি। প্রচুর ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশিত যেমন হচ্ছে; কাউকে টার্গেট করেও অনেক অপতথ্য ছড়ানো হয়। তবে চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রচার চলে। চীন অর্থনৈতিক উন্নতি করতে থাকায় তাদের আঞ্চলিক ও পশ্চিমা প্রতিযোগিরা এই প্রচারে শামিল হয়।

প্রসঙ্গত, দ্য পেপার সাংহাই-ভিত্তিক একটি শীর্ষস্থানীয় চীনা ডিজিটাল গণমাধ্যম। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে। এটি সাংহাই ইউনাইটেড মিডিয়া গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত। এদের কোনো প্রিন্ট ভার্সন নেই, শুধুমাত্র মোবাইল অ্যাপ এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে  থাকে। সুউচ্চ অট্টালিকার সাংহাই শহরে মিডিয়া গ্রুপের ভবনটিও বেশ উঁচু।

দেশের ভেতরে চীনের জনগণ ও বিদেশে চীনা কমিউনিটি এই দুই প্রকারের মানুষ দ্য পেপারের গ্রাহক, পাঠক, দর্শক। মিডিয়াটি প্রতিদিন তাদের ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ৩০০ আর্টিক্যাল প্রকাশ করে। তার অতিরিক্ত হিসেবে দৈনন্দিন ঘটনার খবরও পরিবেশন করে। অ্যাপস এবং ওয়েবসাইট মিলিয়ে দ্য পেপারের দর্শক ও পাঠক ৩০ কোটিরও বেশি। গভীর অনুসন্ধানমূলক স্টোরি, অর্থনীতির খবর এবং তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়।

ভূ-রাজনৈতিক কারণে চীন এখন মিডিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। অন্য সব মিডিয়ার মতোই ‘দ্য পেপার’ আন্তর্জাতিক খবরের ক্ষেত্রে বিদেশি মিডিয়া থেকেও সংবাদ সংগ্রহ করে থাকে। সত্য খবর প্রচার করার লক্ষ্যে দ্য পেপার ফ্যাক্ট চেকিং করে। সরাসরি সূত্র থেকে ‘ডবল চেকিং’ করে সংবাদ পরিবেশন করে।

দ্য পেপার মিডিয়াটি একটি ‘টুলবক্স’ উদ্বোধন করেছে, যার মাধ্যমে জনসাধারণ  নিজেরাই কাজের মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কৌশল রপ্ত করতে পারবে। মিডিয়াটির ওয়েবসাইট চীনা ভাষা ও ইংরেজি ভাষায় সংস্করণ রয়েছে। সেখানে যে কেউ ফ্যাক্ট চেকে আগ্রহী হলে তা যাচাই করতে পারেন।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft