রামেকে হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু, নতুন রোগী ২২
রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ১:৪১ পিএম

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম রোগের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে এখন হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১১৭ শিশু চিকিৎসাধীন। বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। 

তিনি জানান, মঙ্গলবার দুপুর থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই শিশুর সংক্রামক হাম রোগের উপসর্গ ছিল। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২২ জন ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১৪ শিশু। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, হাম কেবল সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়; এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি বায়ুবাহিত ভাইরাস। এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং কোভিড-১৯, এমনকি ইবোলা ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হামের ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ অ্যান্টিবডি নষ্ট করতে পারে। এর ফলে শিশু পরবর্তী সময়ে নিউমোনিয়া বা ফ্লুর মতো সাধারণ রোগেও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতে পারে। হামজনিত নিউমোনিয়ায় ফুসফুসের সংক্রমণ জটিল হওয়ার পর প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহে ভেন্টিলেটর ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) সাপোর্ট না পেলে মৃত্যু হতে পারে।

আরও পড়ুন : টাঙ্গাইলে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে ভোগান্তি

হামের অন্য জটিলতার মধ্যে মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনকেফেলাইটিস), যা থেকে শ্রবণশক্তি হারানো বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা এবং চোখের প্রদাহ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত হলে গর্ভপাত বা কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি থাকে।

জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের (আইপিএইচ) পরিচালক ডা. মো. মোমিনুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নানা কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে এজন্য সবাই যে মারা যাচ্ছে, সেটি ঢালাওভাবে বলা যাবে না। হামের টিকাদান ঠিকমতো না হওয়ায় সংক্রমণ বাড়ছে। নিয়মিত টিকাদান ছাড়াও পাঁচ বছর অন্তর একটি ক্যাম্পেইন হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন হয় ২০২০ সালে। ২০২৪ সালে হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এর বাইরে দুই থেকে তিন বছর ধরে টিকার সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া ঠিকমতো টিকা কেনাও হয়নি। তিনি বলেন, কখনো মাঠ পর্যায়ে সংকট দেখা গেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে ড্রপ-আউটের কারণে অনেক শিশু প্রথম ডোজ টিকা পেলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত তিন মাসে তাদের ল্যাবে হামের ১ হাজার ৬৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৬৯৬ জনের হাম শনাক্ত হয়, যা ৪২.৪১%।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত শিশুর নয় মাস বয়স থেকে হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু এবার প্রথম দেখা গেল নয় মাস বয়স হওয়ার আগেই অনেক শিশু এ ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে। এর কারণ, সন্তান জন্মদানের পর অনেক মা বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েরা নিয়মিত স্তন্যদান করতে পারেন না। বাচ্চাকে সম্পূরক বা বিকল্প খাদ্য ও আর্টিফিশিয়াল দুধ খাওয়ানো হয়। অনেক মা নিজেও প্রয়োজনীয় টিকা নেননি। ফলে মায়ের শরীরে ও বুকের দুধ থেকে যে পরিমাণে ইমিউনিটি (রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা) পাওয়ার কথা, সেটি শিশুর শরীরে তৈরি হয় না।

আরও পড়ুন : মুন্সিগঞ্জে গোসল করতে নেমে কিশোরের মৃত্যু

ইপিআই কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলেন, টিকাদানের জন্য ৩৭ জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই। এই কর্মীরা নির্দিষ্ট কেন্দ্রে টিকা দেন। সারা দেশে টিকাকেন্দ্র আছে প্রায় দেড় লাখ। পোর্টার (টিকা বাহক) আছেন ১ হাজার ৩২৬ জন। এই পোর্টাররা ৯ মাস ধরে বেতন পান না। এছাড়া গত বছর সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যান। ওই সময়ে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কোনো কোনো এলাকায় টিকাও নেই। অভিভাবকদের গাফিলতিতেও ১০ থেকে ২০ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় আসছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে টিকা কেনা হতো সরকারের স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। টিকার সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির সহায়তায় অল্প সময়ে টিকা কেনা সম্ভব ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়।

হামের প্রাদুর্ভাব ও করণীয় নিয়ে সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জাতীয় টিকাসংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (নাইট্যাগ) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশীদ। জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আজকের আলোচনায় রুটিন টিকা প্রদানে ঘাটতির বিষয় তুলে ধরা হয়। এর কারণ হিসাবে বলা হয় অপারেশন প্ল্যান বন্ধ। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে রুটিন টিকার পাশাপাশি ক্যাম্পেইন করে টিকা দেওয়া হবে। জুনের মধ্যে ক্যাম্পেইন শুরু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এজন্য শিশুদের রেজিস্ট্রেশন শুরু হবে। এছাড়া ক্যাম্পেইনে টিকা প্রদানের বয়স ৯ মাস থেকে এগিয়ে এনে ৬ মাস করা হয়েছে। বয়স বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : ঝিনাইদহে ভ্যানের ধাক্কায় পথচারীর মৃত্যু

একই দিন হাম নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আরেকটি সভা হয়। সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক, সিডিসি, আইইডিসিআর, আইসিডিআরবি পরিচালক ও বিএমইউর ভাইরোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আবু হোসেন মোহাম্মাদ মইনুল আহসান সোমবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, হামে মৃত্যু নিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সভার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এভাবে মৃত্যুর বিষয়টি সত্য নয়। তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ক্যাম্পেইন শুরুর পাশাপাশি চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

জ/দি

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft