সংস্কারের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন বাংলার প্রবেশদ্বার ঘোড়াঘাটের ঐতিহাসিক স্থাপত্য

একটা সময় ছিলো, যখন দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটকে বলা হতো প্রাচীন বাংলার প্রবেশদ্বার এবং ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মোঘল আমলের প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে ঘোড়াঘাটের নাম একসময় উচ্চারিত হতো দেশের গন্ডি পেরিয়ে দূরদেশেও। এখানকার প্রাচীন স্থাপত্য, মসজিদ, দুর্গ, মাদরাসা ও প্রশাসনিক ভবনগুলো সেই সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষ্য বহন করে আসছে। কিন্তু সংস্কারের অভাব, অবহেলা এবং প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আজ বিলীন হওয়ার পথে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঘোড়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে মোঘল, পাল, সেন আমল সহ অসংখ্য স্থাপত্য নিদর্শন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঘোড়াঘাট দুর্গ, বারোপাইকের দুর্গ, ঘোড়াঘাট ভাঙ্গা মসজিদ, সুরা মসজিদ, শাহ্ ইসমাইল গাজীর মাজার, নাম সনাক্ত না হওয়া বিরাহিমপুর কাচারী শাহ্ ইসমাইল গাজীর খাদেমের মাজার, শহরগছি সূফী সম্রাট হজরত সামশুদ্দিন ও তার পুত্র কাজী সদর উদ্দিন (র:) এর মাজার শরীফ এবং তাদের বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ সহ আরও অনেক ঐতিহাসিক স্থাপত্য। একসময় এই স্থাপনাগুলো ছিল গবেষক ও পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ স্থাপনাই মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে বা গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ঘোড়াঘাটের ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে হারিয়ে যাবে উত্তরবঙ্গের এক অনন্য ঐতিহ্য, যা শুধু ঘোড়াঘাট নয়, পুরো দেশের ইতিহাসেরই এক অমূল্য সম্পদ। পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে হলে ঘোড়াঘাটের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোর সংরক্ষণ ও পরিচর্যা জরুরি। এতে একদিকে যেমন ইতিহাস রক্ষা পাবে, অন্যদিকে এলাকাবাসীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথও খুলে যাবে। উপজেলার কিছু প্রাচীন মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় হলেও বেশিরভাগই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধান থাকলেও কার্যত সংস্কার বা সংরক্ষণের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে বৃষ্টির পানি ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্ষতির কারণে স্থাপনাগুলোর দেয়াল ও গম্বুজ ভেঙে পড়ছে। কিছু স্থানে আবার স্থানীয় অসাধু ব্যক্তিদের দখলে জমি চলে যাওয়ায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অস্তিত্বও ঝুঁকির মুখে।
এদিকে স্থানীয় যুবসমাজ ও সংস্কৃতি কর্মীরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম চালালেও তা যথেষ্ট নয়। তারা সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ঘোড়াঘাটের হারানো ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় জনসাধারণ ও ইতিহাসপ্রেমীরা সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন, ঘোড়াঘাটের এই অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যাতে বাংলাদেশের প্রাচীন মোঘল স্থাপত্যের এই নিদর্শনগুলো আগামীর প্রজন্মের কাছে জীবন্ত ইতিহাস হিসেবে টিকে থাকে।
ঘোড়াঘাট সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ এসএম মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘোড়াঘাট একসময় ছিল রাজনীতি, বাণিজ্য ও প্রশাসনের মিলনস্থল। কিন্তু এখনকার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ইতিহাসের সাক্ষী এসব স্থাপনা দ্রুত সংস্কার না করা গেলে স্কুল ও কলেজের ছাত্র ছাত্রীরা ভবিষ্যতে তাদের চোখের সামনে থেকে হারিয়ে ফেলবে ঘোড়াঘাটের গর্বের ইতিহাস। তিনি আরও বলেন, অচিরেই এগুলোর অস্তিত্ব যাতে হারিয়ে না যায় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে ইতিহাস রক্ষা করতে হবে।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বগুড়া ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ.কে.এম সাইফুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, ঘোড়াঘাটের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সংরক্ষণ কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পর্যাপ্ত বাজেট ও জনবল না থাকায় তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, উপজেলার ভাঙ্গা মসজিদ ও সুরা মসজিদ এবং প্রাচীন মন্দিরগুলো নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে দুইটি মসজিদ ও মন্দিরগুলো পরিদর্শন করেছি। সংস্কারের জন্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই প্রকল্প অনুমোদন হয়ে সংস্কার কাজ শুরু হবে।
জ/উ