
প্রচণ্ড গরমে শরীরচর্চা করা শুধু অস্বস্তিকর নয়, অনেক সময় তা ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় দৌড়ানো, ফুটবল খেলা বা ভারী ব্যায়াম করলে হিট এক্সহসশন ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমের কারণে দীর্ঘদিন শরীরচর্চা বন্ধ রাখাও স্বাস্থ্যকর নয়। এতে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
আর্জেন্টিনার পন্টিফিকাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির পরিবেশগত জীবনধারা ও মহামারিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ক্রিশ্চিয়ান গার্সিয়া-উইতুলস্কির নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মানুষের শারীরিক কার্যকলাপ কমে গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৭ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, কিছু নিয়ম মেনে চললে তীব্র গরমেও নিরাপদে ব্যায়াম করা সম্ভব।
ভোর বা সন্ধ্যায় ব্যায়াম করুন
ব্যায়ামের জন্য দিনের তুলনামূলক শীতল সময়, অর্থাৎ ভোর বা সন্ধ্যা সবচেয়ে উপযোগী। বাইরে ব্যায়াম করলে রোদ এড়িয়ে ছায়াযুক্ত স্থান বেছে নেওয়া ভালো। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিট অ্যান্ড হেলথ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অলি জে বলেন, ছায়াযুক্ত স্থানের তাপমাত্রা সরাসরি রোদের তুলনায় ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম হতে পারে।
তাপমাত্রার পাশাপাশি আর্দ্রতার দিকেও নজর দিন
শুধু গরম নয়, বাতাসের আর্দ্রতাও শরীরের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকায় না, ফলে শরীরের তাপমাত্রা কমতে দেরি হয় এবং হিট স্ট্রেসের ঝুঁকি বাড়ে। বাতাস চলাচল কম এমন স্থানে ব্যায়াম করলে এই ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পায়।
সময় ও ব্যায়ামের তীব্রতা কমান
প্রচণ্ড গরমের দিনে দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজন হলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে অল্প সময় হাঁটা কিংবা ঘরের ভেতরে হালকা ব্যায়াম করাও উপকারী। অতিরিক্ত গরমে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং মাথা ঘোরা, অস্বস্তি বা ঘুমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিরতিতে শরীর ঠান্ডা রাখুন
ব্যায়ামের মাঝখানে সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ বা ছায়াযুক্ত স্থানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন। পর্যাপ্ত ঠান্ডা পানি পান করুন। প্রয়োজনে ফ্যান ব্যবহার করলে শরীর দ্রুত স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসে।
আইস প্যাকের চেয়ে ঠান্ডা পানি বেশি কার্যকর
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর ঠান্ডা করতে বরফের প্যাকের তুলনায় ঠান্ডা পানি বেশি কার্যকর। হাত, কনুই বা পা ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে রাখা কিংবা শরীরে পানি ছিটিয়ে দিলে শরীরের তাপ দ্রুত কমে। ভেজা ঠান্ডা তোয়ালে দিয়েও শরীর মুছে নেওয়া যেতে পারে।
ব্যায়ামের আগে শরীর ঠান্ডা করুন
শরীরচর্চা শুরুর আগে শরীর কিছুটা ঠান্ডা করে নিলে গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় নিরাপদে ব্যায়াম করা সহজ হয়। ঠান্ডা পানি পান বা বরফ মিশ্রিত পানীয়ও এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।
ধীরে ধীরে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নিন
হঠাৎ দীর্ঘ সময় ব্যায়াম না করে ধাপে ধাপে সময় ও পরিশ্রম বাড়ান। এই প্রক্রিয়াকে হিট অ্যাক্লিমাটাইজেশন বলা হয়। সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিন নিয়মিত গরমে ব্যায়াম করলে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে এবং গরম সহ্য করার সক্ষমতাও উন্নত হয়।
শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দিন
ব্যায়ামের সময় মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বুক ধড়ফড় করা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বন্ধ করুন। দ্রুত ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে গিয়ে শরীর ঠান্ডা করুন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে। তাই শুধু ব্যায়াম করাই নয়, কখন, কোথায় এবং কীভাবে ব্যায়াম করবেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময় নির্বাচন, পর্যাপ্ত পানি পান, শরীর ঠান্ডা রাখা এবং নিজের শারীরিক অবস্থার প্রতি সচেতন থাকলে প্রচণ্ড গরমেও নিরাপদে সুস্থ ও সক্রিয় থাকা সম্ভব।
জ/শা