
দেশের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) আবারও নানা অভিযোগের কারণে আলোচনায় এসেছে। বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অদৃশ্য প্রভাব এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অধিদপ্তরের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোর এখনো স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, গত সরকারের সময় থেকে গড়ে ওঠা একটি প্রভাববলয় এখনো পুরোপুরি ভাঙেনি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রশাসনের ভেতরে সেই নেটওয়ার্কের কিছু অংশ সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বদলি-পদায়নকে ঘিরে অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও লাভজনক পদে বদলি–পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতের বাইরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়।
সূত্রের দাবি, সম্প্রতি কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হলেও তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। এমনকি একজন কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন
ইইডির কয়েকটি জেলার উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কিছু ঠিকাদারের দাবি, নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি।
কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট অঞ্চলের একটি আসবাবপত্র সরবরাহ প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষের কথাও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অধিকাংশ কাজ সীমিতসংখ্যক ঠিকাদারের মধ্যে বণ্টন করা হয়। তবে এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
অধিদপ্তরের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মচারীর অভিযোগ, প্রকল্পের বিল ছাড়, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। তাদের দাবি, ঠিকাদারদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
সম্পদ অর্জন নিয়েও আলোচনা
অনুসন্ধান সূত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ গড়ে তোলার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ অভিযোগেরও আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ উঠলে সম্পদের উৎস যাচাইয়ে দুদক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়।
প্রশাসনিক সংস্কার কতটা কার্যকর?
প্রশাসনিক সূত্রগুলোর মতে, সরকার বিভিন্ন দপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে বদলি–পদায়ন ও সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক প্রভাব কেন্দ্রীভ‚ত হলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই নিয়মিত অডিট, ই-টেন্ডারিংয়ের কার্যকর তদারকি, সম্পদ বিবরণী যাচাই এবং বদলি–পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে রংপুর বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেছেন, ই-জিপি পদ্ধতিতে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা পরে শনাক্ত করা সম্ভব এবং কেউ অনিয়ম করে থাকলে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ফলে এই প্রতিষ্ঠানে ওঠা যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ দ্রæত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সেটিও প্রকাশ্যে তুলে ধরা জরুরি।
তদন্তের দাবি
স্থানীয় ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সুশাসনকর্মীদের দাবি, বদলি–পদায়ন, টেন্ডার, বিল পরিশোধ এবং সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে তদন্ত করা হোক। তাদের মতে, এতে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থাও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
শিক্ষা খাতের উন্নয়নে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জোরদার করার বিকল্প নেই।