
এক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকা যেন স্থবির হয়ে পড়ে। এতে করে প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, সবখানেই জমে থাকে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি, যানজট, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা এবং কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি এখন বর্ষা মৌসুমে এ নগরের নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলাবদ্ধতা কেবল অতিবৃষ্টির ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, জলাশয় ভরাট, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগের সম্মিলিত পরিণতি।
জানা যায়, একসময় ঢাকা ছিল খাল, বিল ও জলাভ‚মির শহর। রাজধানীর চারপাশের নদ-নদীর সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য খাল বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত সরিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখত। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, গত চার থেকে পাঁচ দশকে সেই প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খালের জায়গায় গড়ে উঠেছে সড়ক, বহুতল ভবন, বাজার, গুদাম ও বিভিন্ন স্থাপনা। অন্যদিকে নিচু জলাভ‚মি ভরাট করে নির্মাণ হয়েছে আবাসন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা। ফলে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
মুষ্টিমেয় লোভি মানুষের থাবায় হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জলাধার। এর মধ্যে ঢাকার পূর্বাঞ্চলের ভাটারা, বাড্ডা, আফতাবনগর, সাতারকুল, রামপুরা, ডেমরা, উত্তরার কিছু অংশ এবং অন্যান্য নিম্নাঞ্চল একসময় প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করত। বর্ষার অতিরিক্ত পানি এসব এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পরে নদীতে নেমে যেত। বর্তমানে এসব অঞ্চলের বড় অংশই কংক্রিটের নগরীতে পরিণত হয়েছে। পানি যেখানে জমে থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন বহুতল ভবন ও সড়ক। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সরাসরি মানুষের বসতি ও রাস্তায় জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে।
অপরদিকে, রাজধানীর খালের করুণ অবস্থার বাস্তবতা হলো সরকারি নথিতে খালের কথা উল্লেখ থাকলেও এখানে এখন আর কোন খাল খুঁজে পাওয়া যায়না। এর মধ্যে বেগুনবাড়ী, কল্যাণপুর, রামচন্দ্রপুর, মান্ডা, আব্দুল্লাহপুর, সূত্রাপুর, গজারিয়াসহ অনেক খালের প্রবাহ দখল, ভরাট বা বর্জ্যে ভরে যাওয়ার কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও খালের ওপর স্থাপনা, কোথাও রাস্তা, আবার কোথাও বছরের পর বছর জমে থাকা আবর্জনা পানি চলাচলের পথ সংকুচিত করেছে। সরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করলেও বহু ক্ষেত্রে পুনরায় দখলের অভিযোগ উঠেছে। এতে খাল পুনরুদ্ধারের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
জানা যায়, রাজধানীর ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশ নির্মিত হয়েছিল কয়েক দশক আগে। এরপর নগর বিস্তৃত হয়েছে, জনসংখ্যা বেড়েছে, বহুতল ভবন ও পাকা স্থাপনার সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। অনেক এলাকায় ড্রেনের পানি খালে পৌঁছানোর আগেই বাধাগ্রস্ত হয়। আবার খালের পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় ড্রেনও দ্রুত উপচে পড়ে।
এছাড়াও রাজধানীর খাল, ড্রেনেজ ও জলাধার ব্যবস্থাপনায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ একাধিক সংস্থা কাজ করে। কিন্তু দায়িত্বের বিভাজন ও সমন্বয়ের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। একটি সংস্থা উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত তদারকি না থাকায় আবারও দখলের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও জানা যায়, রাজধানীতে আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরের প্রান্তিক জলাভ‚মিগুলোতে উন্নয়ন কার্যক্রমও বেড়েছে। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদিত ও অননুমোদিত উভয় ধরনের উন্নয়নকাজের কারণে বহু নিম্নাঞ্চল ও জলাধার সংকুচিত হয়েছে। তবে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে আইনি অবস্থান ভিন্ন; কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট নথি, তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তবে এক্ষেত্রে আইন আছে কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের লোভের কারণে ভুগতে হচ্ছে এই নগরের বাসিন্দাদের। জলাধার সংরক্ষণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নগর উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন আইন এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্তে¡ও বাস্তবায়নে নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, দখলমুক্ত করার পর নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অনেক স্থান আবারও অবৈধভাবে দখল হয়ে যায়। দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং দুর্বল তদারকিও কার্যকর পদক্ষেপের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবছর রাজধানীতে কর্মঘণ্টা নষ্ট, যানজট, ব্যবসায়িক ক্ষতি, সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নি¤œআয়ের মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও রোগীরা। অনেক এলাকায় জমে থাকা পানি নোংরা ও দূষিত হওয়ায় ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
এ সব সমস্যা সমাধানে নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নতুন ড্রেন নির্মাণ করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তারা যেসব পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেগুলো হলো, রাজধানীর সব খালের ডিজিটাল মানচিত্র ও সীমানা স্থায়ীভাবে নির্ধারণ। অবৈধ দখলমুক্ত করে খালের স্বাভাবিক প্রস্থ ও পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা। জলাধার ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। নতুন ভবন নির্মাণে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেইনওয়াটার হারভেস্টিং) বাধ্যতামূলক করা। নিয়মিত খাল খনন, ড্রেন পরিষ্কার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা। নগর ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা আর কেবল মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি পরিবেশ, অর্থনীতি এবং নগর ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাভিত্তিক উদ্যোগ।