
গুয়াদালাহারায় স্পেন-উরুগুয়ের ম্যাচ তখনও শেষ হয়নি। শেষ বাঁশির অপেক্ষায় ছিল সবাই। তবে এরই মধ্যে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করার পর মাঠের একপাশে মোবাইল ফোন ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়েন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা। সবার দৃষ্টি তখন স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচের দিকে। স্পেনের জয় নিশ্চিত হতেই আনন্দে ভেসে যায় পুরো দল ও গ্যালারি। ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে।
মাত্র সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের দেশটি জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বকাপ ইতিহাসে অংশ নেওয়া ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি। অথচ নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে তারা। এবার তাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ-বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দে। একদিকে লিওনেল মেসিদের শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য, অন্যদিকে নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্নে বিভোর কেপ ভার্দে।
অপরাজিত থেকে নকআউটে
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের যাত্রা শুরু হয় স্পেনের বিপক্ষে চমক জাগানো গোলশূন্য ড্র দিয়ে। সেই ম্যাচে ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দলকে এনে দেয় গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট।
দ্বিতীয় ম্যাচে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে আবারও নজর কাড়ে দলটি। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য সমতা তাদের নিশ্চিত করে নকআউট পর্ব।
প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েই গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থাকার কৃতিত্ব দেখিয়েছে কেপ ভার্দে।
সাফল্যের পেছনের গল্প
কেপ ভার্দের এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সংগঠিত উদ্যোগের ফল হিসেবেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে দলটি।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তারা পিছনে ফেলে পাঁচবারের আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন ক্যামেরুনকে। ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের পরিকল্পিত কাজ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কেপ ভার্দিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল নেয় ফেডারেশন। সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগাল এবং নেদারল্যান্ডসে বড় কেপ ভার্দিয়ান সম্প্রদায় থাকায় সেখান থেকেই উঠে আসে অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার।
বর্তমান বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জনের মধ্যে ১৪ জনের জন্ম দেশের বাইরে। এর মধ্যে ছয়জনের জন্ম নেদারল্যান্ডসের রটারডামে।
ফরোয়ার্ড ডেইলন লিভরামেন্তো, যিনি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ক্যামেরুনের বিপক্ষে জয়সূচক গোল করেছিলেন, তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
কেপ ভার্দের সংসদ সদস্য জোসিনা ফ্রেইতাস ফোর্তেস বলেন, “আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর পরিশ্রম, দৃঢ় বিশ্বাস এবং অনেক মানুষের অবদান।”
বুবিস্তার নেতৃত্বে বদলে যাওয়া দল
২০২০ সাল থেকে দলের দায়িত্বে থাকা কোচ বুবিস্তার নেতৃত্ব কেপ ভার্দের সাফল্যের বড় ভিত্তি। সাবেক এই আন্তর্জাতিক ফুটবলার দীর্ঘ সময় ধরে দলকে গড়ে তুলেছেন পরিকল্পিতভাবে।
তার অধীনে কেপ ভার্দে হয়ে উঠেছে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সংগঠিত একটি দল। দৃঢ় রক্ষণ, ভারসাম্যপূর্ণ মিডফিল্ড এবং কার্যকর আক্রমণভাগ-সব মিলিয়ে তারা এখন প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।
২০২৩ আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে ঘানাকে হারানো, মিসরের সঙ্গে ড্র এবং কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার মধ্য দিয়েই দলটি নিজেদের সক্ষমতার জানান দিয়েছিল।
বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে কেপ ভার্দে মাত্র একটি ফাউল করেছিল, যা ১৯৬৬ সালের পর কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে সবচেয়ে কম ফাউলের রেকর্ড।
উরুগুয়ের বিপক্ষেও পিছিয়ে পড়ার পর দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে সমতা ফেরায় তারা। এতে দলের মানসিক দৃঢ়তারও প্রমাণ মেলে।
কোচ বুবিস্তা বলেন, “ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা দল হিসেবে আমাদের পরিচয়, শক্তি ও ঐক্য তুলে ধরতে পেরেছি।”
বিশ্বকাপে দলকে তোলার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (ক্যাফ) তাকে বর্ষসেরা কোচ নির্বাচিত করে।
তিনি বিশ্বাস করেন, কেপ ভার্দের এই সাফল্য বিশ্বের অন্যান্য ছোট দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করবে। বুবিস্তার ভাষায়, “আমি বিশ্বাস করি, ফুটবল সবার জন্য।”
জ/উ