
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা জেলা যুবদলের সভাপতি ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি চিহ্নিত আওয়ামী লীগ নেতা, সঙ্গী এবং দলত্যাগ করে আওয়ামী লীগে ভিড়ে যাওয়া নেতাদের দলে ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক পুনর্বাসন দিচ্ছেন। এই কর্মকাণ্ড স্থানীয় বিএনপিতে তীব্র ক্ষোভ ও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। মুরাদ তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা ও জনসমর্থন বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
জানা যায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিরা এখন মুরাদের হাত ধরে বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলেন এমএ জলিল, যিনি একসময় ধামরাই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কিন্তু গত ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজির আহমদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে বিএনপি ত্যাগ করেন এবং আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিতেন। গত ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর তিনি মুরাদের সঙ্গে আবার বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন।
অন্যান্য চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন, ধামরাইয়ের কাওয়ালীপাড়া বাজারের সমাবেশে অংশ নেয়া যুবলীগ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বেনজির আহমদের ঘনিষ্ঠ নূরে আলম সিদ্দিকী নান্নু। যিনি পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনার আসামি হওয়া সত্ত্বেও গত ৫ আগস্টের পর মুরাদের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। সুতিপাড়া ইউনিয়নে ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী বেনজির আহমদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয়া রমিজুর রহমান রোমা, যিনি আওয়ামী আমলে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনিও সরকার পতনের পর মুরাদের হাত ধরে বিএনপিতে ফিরে এসেছেন।
এছাড়াও, ধামরাই পৌরসভার সাবেক আওয়ামী লীগপন্থী নেতা নাইমুর ফারদুন (মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী), নান্নার ইউনিয়নের সাবেক যুবলীগ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক (যিনি ছাত্র হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন), আওয়ামী লীগ কর্মী রোমান ও সবুজ মুরাদের মাধ্যমে বিএনপির কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। গাংগুটিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি পদপ্রার্থী খোকন মুন্সি এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের মোল্লার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশ নেয়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি তুলা মিয়া ও আজিজুল হকও এখন মুরাদের পক্ষে ভিড়েছেন।
আরও জানা যায়, এই পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ার ফলস্বরূপ স্থানীয় বিএনপিতে সংঘাত ও বিভাজন চরমে পৌঁছেছে। গাংগুটিয়া ইউনিয়নে মুরাদ ঘনিষ্ঠ যুবলীগ নেতা খোকন মুন্সি ও তার সহযোগী সুনীল সাহা (যাকে মুরাদের ডান হাত বলা হয়) স্থানীয় ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তমিজ উদ্দিনপন্থী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এই বিরোধের জেরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মফিকুল ইসলাম আহত হন এবং আবুল কাশেম নামে এক কর্মী নিহত হন। স্থানীয় বিএনপির দাবি, এই হত্যাকাণ্ডে মুরাদ ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ-ঘরানার নেতা-কর্মীরাই জড়িত ছিলেন। ধামরাই থানার একটি সূত্রও এই হত্যাকাণ্ডে মুরাদের অনুসারীদের জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মুরাদ মূলত ধামরাইয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাশী, তিনি ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি তমিজ উদ্দিন এবং সামসুল ইসলামের সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে অংশ না নিয়ে নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছেন। এতে দলের মধ্যে ঐক্য ভেঙে যাচ্ছে এবং আগামী নির্বাচনে দলের ঐক্য ধরে রাখা অসম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীরা।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী বলছেন, মুরাদ ‘সংগঠন শক্তিশালী করার’ নামে বিতর্কিত মুখদের দলে টানছেন। যাদের অতীতে আওয়ামী লীগের হয়ে ভ‚মিকা ছিল স্পষ্ট। এনিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ দলের উচ্চতর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া বন্ধের এবং দলের বিভাজন নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে যোগাযোগ করা হলে এই বিষয়ে ঢাকা জেলা যুবদল সভাপতি ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ বলেন তিনি এই ধরণের কোন কাজে যুক্ত নন। আওয়ামিলীগের সময় যারা ব্যাবসা বানিজ্য করেছে, কোন অন্যায় কাজে যুক্ত হয়নি, এমন অনেকেই যদি বিএনপির পক্ষে কাজ করে তবে কোন সমস্যা দেখিনা বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি তমিজ উদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।