কপ-৩০
জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
ফারহানা তাহের তিথি
প্রকাশ: শনিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৫, ৩:২৪ পিএম আপডেট: ১১.১১.২০২৫ ৫:৪৪ পিএম

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকট যখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, তখন ব্রাজিলের বেলেমে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের ৩০তম অধিবেশন—কপ-৩০। অ্যামাজন রেইনফরেস্টের প্রবেশদ্বার এই শহরে দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন প্রায় ১৫০টি দেশের প্রতিনিধি। 

তবে শুরু থেকেই আলোচকদের ধারণা, এবারের কপ সম্মেলন বড় কোনো চুক্তি বা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত আনবে না। তবুও, কিছু নির্দিষ্ট ইস্যু ঘিরেই এবারের সম্মেলনের মূল আলোচনা গড়ে উঠছে জলবায়ু ন্যায়বিচার, বৈশ্বিক অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর।

জলবায়ু ন্যায়বিচার: বৈশ্বিক আলোচনার অগ্রভাগে

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice) বিষয়টি। উন্নত দেশগুলোর শিল্পোন্নয়নের দায়ে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্ষতির ভার বইছে বহুদিন ধরেই। এবারের কপ সম্মেলনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো—বিশেষ করে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, নেপাল ও ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো—এই ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জোরালো দাবি তুলেছে।


বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, “জলবায়ু ন্যায়বিচার এখন আর নীতিগত আলোচনা নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন।”
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিলে (Loss and Damage Fund) সরাসরি অর্থ প্রবাহের নিশ্চয়তা দিতে হবে, না হলে ন্যায়বিচার কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

অর্থায়নই প্রধান চ্যালেঞ্জ

বিগত কপ সম্মেলনগুলোতে যেভাবে জলবায়ু অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি, এবারে সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো দাবি তুলেছে—২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।


এছাড়া, ২০২৬ সালের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিল চালু করারও দাবি জানানো হচ্ছে। বাংলাদেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাতের মতে, “অর্থই জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তি। সরাসরি অর্থপ্রবাহ ছাড়া ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি কেবল প্রতীকী থেকে যাবে।”

অভিযোজন: টিকে থাকার কৌশল

অভিযোজন (Adaptation) ইস্যুটিও এবারের কপ-৩০ এ বড় গুরুত্ব পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জনগণকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুত করতে চায়। বাংলাদেশ, যেটি জলবায়ু ঝুঁকির ফ্রন্টলাইনে, এবারের সম্মেলনে দাবি তুলেছে—২০২৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করতে হবে, বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে পরিচালিত নারী ও তরুণ নেতৃত্বাধীন প্রকল্পগুলোতে।

সিসিইইআর-এর সহকারী পরিচালক রওফা খানম বলেন, “বাংলাদেশের জনগণ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তার মূল্য দিচ্ছে। এখন প্রতিশ্রুতির নয়, বাস্তব সহায়তার সময় এসেছে।”

ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর

এবারের সম্মেলনে আলোচনার অন্যতম বড় বিষয় হলো জাস্ট ট্রানজিশন (Just Energy Transition)— অর্থাৎ, জ্বালানি খাতে ন্যায়সঙ্গত রূপান্তর। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর যেন শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেটিই এখানে মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশ ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ চায়, উন্নত বিশ্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিক।

ব্রাজিলের বার্তা: ‘অ্যামাজন পৃথিবীর ফুসফুস’

আয়োজক দেশ ব্রাজিল এবারের কপ-৩০-কে ব্যবহার করতে চায় এক প্রতীকী উপলক্ষ হিসেবে। প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরেভার ফ্যাসিলিটি’ নামের একটি আর্থিক কাঠামো চালু করা হবে, যাতে উষ্ণমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণে আগ্রহী দেশগুলোকে পুরস্কৃত করা যায়। 


তবে একই সঙ্গে অ্যামাজনে নতুন তেল অনুসন্ধানের অনুমোদন দেওয়ায় ব্রাজিলের জলবায়ু নীতির প্রতি সমালোচনা উঠেছে।

ব্রাজিলের আদিবাসী মন্ত্রী সোনিয়া গুয়াজাজারা বলেন, “আমরা এই ভূমি জীবন দিয়ে রক্ষা করেছি। অ্যামাজন ধ্বংস হলে জলবায়ু ব্যবস্থাও ধসে পড়বে।”

অংশগ্রহণ কমেছে, প্রত্যাশাও সীমিত

জাতিসংঘের (UNFCCC) তথ্য অনুযায়ী, এবারের কপ-৩০ এ নিবন্ধিত প্রতিনিধি মাত্র ১২,২০০ জন— যা গত বছরের দুবাইয়ের কপ-২৮-এর তুলনায় প্রায় সাতগুণ কম। 


পর্যবেক্ষকদের মতে, এই অংশগ্রহণের হ্রাসই প্রমাণ করছে যে বৈশ্বিক ঐক্য ও আগ্রহ কমে গেছে, যা জলবায়ু কূটনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের কপ সম্মেলন কোনো নতুন ঐতিহাসিক চুক্তি না আনলেও এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ড. আইনুন নিশাত বলেন,“বেলেম থেকে অলৌকিক কিছু আশা করা ঠিক নয়। তবে প্রতিটি কপ ভবিষ্যতের পথ দেখায়। কপ-৩০ যদি বাস্তব ফলাফল না দিতে পারে, সেটি হবে শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়— মানবতার ব্যর্থতা।”

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


Also News   Subject:  অন্যান্য   কপ-৩০ সম্মেলন   জাতিসংঘ   ব্রাজিল  







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft