
বিশ্বের নজর বর্তমানে ব্রাজিলের বেলেম শহরের দিকে। অ্যামাজনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই শহরে গত সোমবার (১০ নভেম্বর) শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন কপ-৩০। দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলনে প্রায় ১৫০টি দেশের প্রতিনিধির অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। তবে, রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থায়নের ঘাটতি এবং বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবনতির কারণে সম্মেলন নিয়ে আগের মতো উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে না। সম্মেলনের এই মঞ্চে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আশা কম, বিশেষ করে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে।
বাংলাদেশ এবারের সম্মেলনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরছে। এর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অভিযোজন সহায়তা, এবং বৈশ্বিক অর্থায়ন। এসব দাবির মধ্যে বিশেষভাবে ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের দাবি, স্থানীয় এবং নারী নেতৃত্বাধীন অভিযোজন প্রকল্পে অর্থায়ন দ্বিগুণ করার দাবি, এবং বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলার প্রতিষ্ঠা করার দাবি উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের ৫টি অগ্রাধিকার লক্ষ্য:
১. ২০৩৫ সালের মধ্যে বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্য নির্ধারণ
২. ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিল (লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড) ২০২৬ সালের মধ্যে চালু করা
৩. অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করা, বিশেষ করে স্থানীয়, নারী ও তরুণ নেতৃত্বাধীন প্রকল্পে
৪. ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা
৫. ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড অ্যানভায়রনমেন্টাল রিসার্চের সহকারী পরিচালক রওফা খানম বলেন, "বাংলাদেশের জনগণ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তার মূল্য দিচ্ছে। এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতির কথা নয়, আমরা চাই জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার।"
ব্রাজিলের অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ
ব্রাজিল এবারের সম্মেলনকে শুধুমাত্র কূটনৈতিক মঞ্চ হিসেবে নয়, বরং একটি প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। দেশের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্ট ফরেভার ফ্যাসিলিটি’ নামে একটি নতুন আর্থিক কাঠামো ঘোষণা করেছেন, যার লক্ষ্য উষ্ণমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে পুরস্কৃত করা। ব্রাজিলের উদ্দেশ্য, "অ্যামাজন রেইনফরেস্ট শুধু দক্ষিণ আমেরিকার নয়, এটি পৃথিবীর ফুসফুস," এই বার্তাটি বিশ্ব নেতাদের কাছে পৌঁছানো।
তবে, সম্মেলনের মাত্র কয়েক মাস আগে ব্রাজিল সরকার অ্যামাজন বেসিনে নতুন তেল অনুসন্ধানের অনুমোদন দিয়েছে, যা তাদের জলবায়ু নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত ব্রাজিলের জলবায়ু অবস্থানকে সংকটের মধ্যে ফেলতে পারে।
আদিবাসীদের নেতৃত্ব
আদিবাসী সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এবারের সম্মেলনে আরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তারা শুধু অংশগ্রহণ করছে না, বরং নেতৃত্বের ভূমিকায় উঠে এসেছে। প্রায় শতাধিক আদিবাসী নেতা নৌবহর নিয়ে বেলেমে আসছেন, এবং নিজেদের প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবে তাঁবু স্থাপন করছেন। ব্রাজিলের আদিবাসী কর্মী ও মন্ত্রী সোনিয়া গুয়াজাজারা বলেছেন, "দশকের পর দশক আমরা এই ভূমি জীবন দিয়ে রক্ষা করেছি। অ্যামাজন ধ্বংস হলে জলবায়ু ব্যবস্থাও ধসে পড়বে।"
বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি
বাংলাদেশের পক্ষে এবারের সম্মেলনে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামেরিটাস অধ্যাপক ও খ্যাতনামা জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। তিনি বলেন, "বাংলাদেশকে কপ-৩০-এ তার লক্ষ্যগুলো খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা কী চাই—অর্থায়ন, অভিযোজন, না প্রযুক্তি হস্তান্তর।" তিনি আরও যোগ করেন, "বাংলাদেশের মূল দাবি জলবায়ু অর্থায়নে সরাসরি প্রবেশাধিকার হওয়া উচিত। অর্থই জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তি।"
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশকে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবনী ও সহনশীল জাতি হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত। আমাদের অভিযোজন কৌশলগুলো যেমন ভাসমান কৃষি, সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্র— এগুলো বিশ্বব্যাপী প্রযোজ্য।"
কপ-৩০: সম্মেলনের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ
কপ-৩০ সম্মেলনে বড় কোনো চুক্তি হবে না, এমনটাই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে, এই সম্মেলনটি বিশ্ব নেতাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ হতে চলেছে। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে সম্মেলনটি সফল না হলে তা কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং মানবতার ব্যর্থতা হিসেবেও চিহ্নিত হবে।
ড. নিশাত বলেন, "যদি কপ-৩০ বাস্তব ফলাফল দিতে ব্যর্থ হয়, এটি শুধু কূটনৈতিক ব্যর্থতা হবে না— এটি হবে মানবতার ব্যর্থতা।"
এবারের কপ-৩০ সম্মেলন খুব একটা আশাব্যঞ্জক চুক্তি আনবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা বলছেন, এটি বিশ্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে: আমরা কি এখনও একসাথে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সক্ষম, নাকি রাজনৈতিক বিভাজন সেটিকেও গ্রাস করছে? বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এটি একটি জীবনের লড়াই। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা—এসব বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই, এবারের সম্মেলনে যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে তা শুধু একটি কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, মানবতার জন্য একটি বিপর্যয় হতে পারে।