
ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া মানেই শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ, বিতর্ক আর প্রতিশোধের নতুন অধ্যায়। ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হাতের গোল’ থেকে শুরু করে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড। দুই দলের দ্বৈরথে বারবার জন্ম নিয়েছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো।
স্থানীয় সময় বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এই ম্যাচের বিজয়ী দল সরাসরি খেলবে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সেই পুরোনো শত্রুতাই ফিরে আসছে নতুন রূপে।
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি বনাম হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহ্যাম। ৩৯ বছর বয়সী মেসি এবারের বিশ্বকাপে ৮ গোল করে এখনও টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা পারফর্মার। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা বেলিংহ্যাম এবং অধিনায়ক হ্যারি কেইন মিলে দলের ১৩ গোলের ১২টিই করেছেন। ফলে ম্যাচটি হয়ে উঠতে পারে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের লড়াই।
স্পোর্টস্টারের ম্যাচ-পূর্ব বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দুই দলই একে অপরকে খুব ভালোভাবে চেনে। আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের মতো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেন। ফলে দুই শিবিরের খেলোয়াড়দের মধ্যে পরিচিতি এবং কৌশলগত বোঝাপড়াও এই ম্যাচকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঐতিহাসিক আবহকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাননি। তার ভাষায়, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাচ, তবে মাঠে বর্তমানটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ অন্যদিকে ইংল্যান্ড শিবিরও অতীতের আবেগ নয়, বর্তমানের পারফরম্যান্সেই মনোযোগ রাখতে চাইছে।
১৯৬৬ সালে আন্তোনিও রাত্তিনের বিতর্কিত বহিষ্কার থেকে শুরু করে ২০ বছর পর ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হাতের গোল’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’, সেন্ট-এতিয়েনে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড থেকে সাপ্পোরোতে পেনাল্টিতে তাঁর প্রতিশোধের গল্প। প্রতিটি দেখাই এই দ্বৈরথে এমন এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে, যা ৯০ মিনিটের খেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। সেইসব দুপুরের স্মৃতিগুলোই আজ (বাংলাদেশ সময় রাত ২টা) রাতে আটলান্টায় ফিরে আসবে, যখন বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটের জন্য ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে।
অতীতের ইতিহাস বাদ দিলেও বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট রোমাঞ্চ জোগাচ্ছে। আশ্চর্যজনকভাবে, লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারে এই প্রথম সিনিয়র আন্তর্জাতিক স্তরে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। যে ক্যারিয়ারে তিনি ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের প্রায় প্রতিটি মূল্যবান রেকর্ড নিজের নামে পুনর্লিখন করেছেন। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার মূল চালিকাশক্তি। আটটি গোল এবং একের পর এক ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপদের মুখ থেকে টেনে তুলেছেন। লিওনেল স্কালোনির দল সবসময় যে খুব একটা দাপট দেখিয়ে জিতেছে তা নয়; মিশরের বিরুদ্ধে তাদের ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছে এবং সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়তে হয়েছে, তবে তারা বারবার জয়ের পথ খুঁজে নিয়েছে।
তবে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ এখন আর কেবল মেসির ওপর নির্ভরশীল নয়। লাউতারো মার্তিনেজের জায়গায় গত দুই ম্যাচে শুরুর একাদশে খেলা হুলিয়ান আলভারেজ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ডেডলক ভেঙে গোল করেছিলেন। এবং তার মাঠের শক্তি দলটিকে এক ভিন্ন ধার এনে দেয়। তিনি ডিফেন্ডারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, মেসি যে জায়গাগুলো ছেড়ে আসেন সেখানে আক্রমণ চালান। আর যখন ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে পেছনে হটতে বাধ্য করা হয় তখন তারা যেভাবে খেই হারিয়ে ফেলে, সেই পরিস্থিতিতে ছোট জায়গায় আলভারেজের মুভমেন্ট মেসির জাদুকরী দক্ষতার মতোই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ইংল্যান্ডও সমানভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখিয়েছে। থমাস টুখেলের দল মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠেছে, যেখানে জুড বেলিংহ্যামের অতিরিক্ত সময়ের বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স দলটিকে সেমিফাইনালে নিয়ে এসেছে। হ্যারি কেইন এবং বেলিংহ্যাম মিলে ১২টি গোল করেছেন, যা ইংল্যান্ডকে এমন দুজন ম্যাচ-উইনার এনে দিয়েছে যারা আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক শক্তির সাথে সমান তালে লড়াই করতে সক্ষম।
এই দুই দলের কৌশলগত লড়াইয়ের মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে যাচ্ছে মাঝমাঠ। ডোকলাইন রাইস এবং এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন মেসি রক্ষণ ও মাঝমাঠের লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গা খুঁজে না পান; পাশাপাশি অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেসের পাসিংয়ের ছন্দকেও তাদের রুখে দিতে হবে। অন্যদিকে, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে সামলাতে হবে কেইন ও বেলিংহ্যামের মুভমেন্ট। সেই সাথে বুকায়ো সাকা (যদি তিনি ননি মাদুয়েকের জায়গায় শুরুর একাদশে খেলেন) এবং অ্যান্থনি গর্ডনের মাধ্যমে উইং বা প্রান্তগুলো থেকে আসা ইংল্যান্ডের আক্রমণও তাদের ঠেকাতে হবে। ‘থ্রি লায়ন্স’ (ইংল্যান্ড) চলতি টুর্নামেন্টে যৌথভাবে সবচেয়ে বেশি হেডে গোল (৪টি) করেছে এবং সবচেয়ে বেশি হেডের চেষ্টা (২৪টি) চালিয়েছে, যা বক্সের ভেতর আসা ক্রসগুলোর কারণে স্কালোনির শিষ্যদের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হবে।
তবে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার লড়াই কখনোই কেবল আর দশটা সাধারণ ম্যাচের মতো ছিল না। একদিকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ১৯৬৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপার অপেক্ষায় থাকা ইংল্যান্ড। তাই সেমিফাইনালের ৯০ মিনিট শুধু ফাইনালের একটি টিকিটই নির্ধারণ করবে না, বরং ফুটবল ইতিহাসে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়েরও জন্ম দিতে পারে।। প্রতিটি প্রজন্মই এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতার নিজস্ব রূপ উত্তরাধিকার সূত্রে পায়।
যেখানে অতীতের বীরদের স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর পাশাপাশি যোগ হয় নতুন নতুন নায়কদের নাম। আগামী বুধবার, মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং আবেগে ঠাসা এক দ্বৈরথের নতুন মঞ্চ, যেখানে ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াই এই ম্যাচটিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে যদিও এই দুই দলের লড়াইয়ের উত্তাপ বাড়াতে বাড়তি কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন পড়ে না বললেই চলে।