
মানব পাচারের অভিযোগে পল্টন মডেল থানায় করা মামলায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ফের ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। রোববার (২৯ মার্চ) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
শুনানিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর সিন্ডিকেটের মূল হোতা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এই সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তবে ফারুকীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মাসুদ বলেন, ‘ফালতু কথা।’
পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে এদিন তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক মো. রায়হানুর রহমান তার ফের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। পরে ১টা ৫০ মিনিটে তাকে আদালতে তোলা হয়। ২টা ১৭ মিনিটে বিচারক এজলাসে উঠেন। এরপর রিমান্ডের বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। শুনানিতে তদন্তকারী কর্মকর্তা রায়হানুর রহমান বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে সময়স্বল্পতার কারণে সম্পূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ২০২২-২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় কতজন কর্মী পাঠিয়েছেন, আসামির এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো যাত্রীদের মধ্যে কতজন ফেরত এসেছেন তার তথ্য, মেডিকেল ফি বাবদ কত টাকা গ্রহণ করেছেন, পলাতক আসামি গ্রেফতার, আত্মসাৎ করা টাকা উদ্ধার এবং ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার ডকুমেন্টগুলো পর্যালোচনার জন্য পুনরায় সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড প্রয়োজন।’
এ সময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ওনার সম্পৃক্ততা বিবেচনায় ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছিলেন। তাকে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে আসামি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। এ মামলায় আসামি এসএম রফিক গত ১ ডিসেম্বর আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘নুর আলী, সাবেক অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নিজাম হাজারী, হাসিনার পিএস আলাউদ্দিন নাসিম, গোলাম মোস্তফা অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতেন। শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সিন্ডিকেটের সুবিধাভোগী ও সম্পৃক্ত। মালয়েশিয়ায় প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল সরকারের। কিন্তু তখনকার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদসহ কয়েকজন মিলে সিন্ডিকেট করেন। সবাই একত্রিত হয়ে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তবে এসব কথা শুনে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মাসুদ বলেন, ‘ফালতু কথা।’
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুল ইসলাম সজীব বলেন, এ মামলায় আদালত সন্তুষ্ট হয়ে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন। মামলার এজাহারে আসামি মাসুদের নাম ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। পাঁচ দিনের রিমান্ডে কী তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেটা আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। মামলায় প্রথমে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এসেছিল। পরে মামলাটি ফের তদন্তে পাঠানো হয় এ পর্যায়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ডের আবেদনটি আইন অনুযায়ী হয়নি। মূলত তাকে অপমান, অপদস্থ করতে মামলায় নাম আনা হয়েছে। তার ৭২ বছর বয়স, বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। রিমান্ডের অগ্রগতি নেই, পূর্বে চূড়ান্ত প্রতিবেদন এসেছিল এবং স্বাস্থ্যগত বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তার রিমান্ড বাতিল প্রার্থনা করছি। শুনানি শেষে আদালত তার ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর পুলিশ প্রহরায় তাকে পৌনে ৩টায় আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়।
এর আগে ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২৪ মার্চ তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন আদালত। পরে ২৫ মার্চ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়। এর আগে সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ এবং মানব পাচারের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় মামলাটি করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপ্রাইটর আলতাব খান।
মামলায় সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, সাবেক সংসদ-সদস্য, এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপ্রাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপ্রাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা মাফিয়া সিন্ডিকেট-চক্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে সংবিধানের মূলনীতি পরিপন্থি জঘন্য অপরাধ করেছেন। আসামি সাবেক সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছেলেকে সিন্ডিকেট-চক্রের সদস্য হিসাবে ব্যবহার করেছেন। আর সাবেক প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার পরিবারের সদস্য অর্থাৎ স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবহির্ভূতভাবে একটি প্রবাসী নামক অ্যাপ চালু করার অনুমোদন দিয়ে চক্রকে সহযোগিতা করেছেন। পরস্পর যোগসাজশে মামলার বাদীর সরলতার সুযোগে ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানব পাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসাবে প্রত্যেকের দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের ১২ কোটি ৫৬ লাখ এক হাজার টাকা আদায় করেছে। এছাড়া তারা সংঘবদ্ধভাবে অন্য ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে তা আত্মসাৎ করেন।
জ/উ