
কয়েকবছর আগেও কৃষিনির্ভর জনপদ হিসেবে পঞ্চগড়ের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে একসময় দেখা মিলত ধান, গম, কাউন, ধেমশী কিংবা ভুট্টার চাষ। এখন চিত্র অনেকটা পালটে সমতলের বুকজুড়ে গড়ে ওঠা সবুজ চা বাগান বদলে দিয়েছে জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। ধীরে ধীরে পঞ্চগড় এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় চা উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
দুই দশক আগে সমতলে চা চাষ নিয়ে সংশয় থাকলেও সময়ের ব্যবধানে সেই ধারণা বদলে গেছে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া চা চাষ বর্তমানে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে এই খাতে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও পঞ্চগড়ের চা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে চা বাগানের সংখ্যা ৭ হাজার ৩৪৮টি। প্রায় ১০ হাজার একর জমিতে চায়ের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে তেঁতুলিয়ায় সর্বাধিক ৪ হাজার ৬৪০ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। এছাড়াও পঞ্চগড় সদর, বোদা, আটোয়ারী ও দেবীগঞ্জ উপজেলাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে চায়ের আবাদ বিস্তৃত হয়েছে।
প্রতি বছর এসব বাগান থেকে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি কেজির বেশি কাঁচা চা পাতা উৎপাদিত হচ্ছে। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় পৌনে দুই কোটি কেজি চা। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে জেলায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৩০টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর মধ্যে কয়েকটি কারখানায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে চা উৎপাদন করা হচ্ছে।
চা শিল্পের সম্প্রসারণের ফলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হয়েছে। ২০০৬ সালে যেখানে এই খাতে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় হাজার, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজারে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখন চা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।
২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় অনলাইনভিত্তিক চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই নিলাম কেন্দ্র চালুর পর স্থানীয় উৎপাদকরা আরও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং শিল্পে নতুন গতি এসেছে। ক্ষুদ্র চাষিদের কাছেও চা চাষ এখন লাভজনক হয়ে উঠেছে। কাঁচা চা পাতা বিক্রি করে অনেক কৃষক বছরে একরপ্রতি দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। এই শিল্পকে ঘিরে বছরে প্রায় ২৮০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশের চা শিল্পে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় হিসেবে বিবেচিত।
বোদা উপজেলার মাড়েয়া কলোনী এলাকার চা চাষি আবু সাঈদ বাদশা বলেন, আমি ২৫ বিঘা জমিতে চা চাষ করছি। আগে অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভ কম হতো, কিন্তু চা চাষ আমাকে স্বচ্ছলতা দিয়েছে। এখন ধানের চেয়ে চায়ে লাভ বেশি।
তেঁতুলিয়া উপজেলার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, চা শিল্পের কারণে এলাকায় কর্মসংস্থান বেড়েছে। আগে কাজের জন্য অনেক মানুষ অন্যত্র যেতেন। এখন স্থানীয়ভাবে চা বাগান ও কারখানায় কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তেঁতুলিয়া, সদর, আটোয়ারী, বোদা ও দেবীগঞ্জের বিস্তীর্ণ সমতল এখন সবুজ চা বাগানে আচ্ছাদিত। রাস্তার ধারে, উঁচু পতিত জমিতে, পুকুরের পাড়ে এমনকি বাড়ির আঙিনাতেও ছোট-বড় চা বাগান গড়ে উঠেছে। অনেক কৃষক চায়ের পাশাপাশি সুপারি, আম কিংবা তেজপাতাকে সাথী ফসল হিসেবে আবাদ করছেন।
দেবীগঞ্জ উপজেলার পপুলার টি ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, চা শিল্পকে রক্ষায় আমিই প্রথম ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। একসময় লোকসানের কারণে অনেকে চা বাগান কেটে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হওয়ায় চাষিরা লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন।
তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়ের চায়ের মান এখন সারা দেশে পরিচিতি পেয়েছে। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া চা চাষের জন্য উপযোগী। সরকারের আরও সহযোগিতা পেলে এ শিল্প দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখবে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, পঞ্চগড়ের চা ইতোমধ্যে গুণগত মানের জন্য সুনাম অর্জন করেছে। উত্তরাঞ্চল এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ চা উৎপাদন এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিল্প সম্প্রসারণের ফলে এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটছে। শুধু অর্থনীতির হিসাবেই নয়, পঞ্চগড়ের চা বাগান এখন পরিবর্তনের প্রতীকও হয়ে উঠেছে। একসময় যে মাঠে দুলত ধানের শীষ, আজ সেখানে সবুজ চা পাতার ভাঁজে ভাঁজে লেখা হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা, নতুন স্বপ্ন আর সমৃদ্ধির গল্প।
জ/দি