আছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত; তবু পর্যটক আসে না কেন?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৫১ পিএম

বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়জুড়ে চা বাগান আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত বালুকাবেলা; প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো ঘাটতি নেই বাংলাদেশে। তবুও আন্তর্জাতিক পর্যটনের দৌড়ে দেশটি অনেক পিছিয়ে দেশটি। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে ছয় লাখের মতো। যেখানে প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কা প্রতিবছর কয়েক কোটি পর্যটক টানে, সেখানে এই সংখ্যা সত্যিই নগণ্য।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে বড় কারণ দেশের ভাবমূর্তি। বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রায়ই দেখানো হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতা কবলিত দেশ হিসেবে। কখনো আবার সস্তা শ্রমের পোশাকশিল্পের খবরের কারণেই শিরোনাম হয় বাংলাদেশ। নেটিভ আই ট্রাভেলের পরিচালক জিম ও’ব্রায়েন বলেন, মানুষের অবচেতন মনে বাংলাদেশ মানেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় আর দারিদ্র্য। ভালো খবরগুলো খুব কমই বাইরে যায়।

এই নেতিবাচক ধারণা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেক সময়ই মেলে না। ঢাকাভিত্তিক ট্যুর অপারেটর ফাহাদ আহমেদের মতে, আধুনিক পর্যটকরা আর কেবল বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়, খুঁজছেন লোকাল এক্সপেরিয়েন্স। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। এখানকার পুরান ঢাকা, নৌবন্দর, কাপড়ের বাজার; সবই জীবন্ত ইতিহাস। আবার শ্রীমঙ্গলের চা বাগান কিংবা কক্সবাজারের সমুদ্র; সবমিলিয়ে বাংলাদেশে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা আছে।

আরও পড়ুন : দক্ষিণ এশিয়ায় পোর্তো বিজনেস স্কুলের অফিশিয়াল কনসালট্যান্ট ‘ট্রাভেলারকি’

কক্সবাজারের ৭৫ মাইল দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত বলা হয়। তবুও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা হাতে গোনা। অন্যদিকে, দেশের দক্ষিণে সুন্দরবন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য; যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস। নদী-খাল আর ম্যানগ্রোভে ঘেরা এই অঞ্চল বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারত।

বিদেশি পর্যটক আনন্দ প্যাটেল প্রথমে বাংলাদেশকে তার ‘বাকেট লিস্টে’ রাখেননি। কিন্তু ভুটান ভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেয়ে তিনি চমকে যান। ঢাকার কোলাহল পেরিয়ে তিনি ছয় ঘণ্টার বাসযাত্রায় পৌঁছান বরিশাল। সেখানে নদীবন্দরের ভাসমান বাজার, নৌকায় করে কৃষকদের পণ্য বেচাকেনা; সবই তার কাছে ছিল একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, এটা কোনো সাজানো পর্যটন দৃশ্য ছিল না, ছিল একদম খাঁটি স্থানীয় জীবন।

আয়ারল্যান্ডের পর্যটক গ্যারি জয়েস পুরান ঢাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, এই শহর কখনো ঘুমায় না। শব্দ, রঙ আর মানুষের স্রোত; সব একসঙ্গে হৃদয়ে হানা দেয়। সেটাই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। তবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির আরেকটি দিকও আছে, যা পর্যটনকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ইউটিউব বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভ্লগার ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের ‘অন্ধকার দিক’ তুলে ধরেন; ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ, বর্জ্যে ভরা এলাকা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজভাঙা শিল্প। ঢাকা ট্যুর গাইডসের কাওসার আহমেদ মিলন বলেন, কিছু মানুষ ‘গারবেজ সিটি’ দেখিয়ে ভিউ বাড়াতে চায়। কিন্তু এতে দেশের সঠিক চিত্র ফুটে ওঠে না।

আরও পড়ুন : ঢাকায় নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের যোগদান

বাংলাদেশের ইতিহাসও সহজ নয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগ, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, এরপর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় লাখো প্রাণহানি; সবমিলিয়ে দেশটি বহু সংকট পেরিয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনী সহিংসতাও বিদেশিদের মনে শঙ্কা তৈরি করে। ট্যুর কোম্পানি লুপিন ট্রাভেলের প্রতিষ্ঠাতা ডিলান হ্যারিস বলেন, নির্বাচনের সময় কিছুটা অস্থিরতা থাকে, যা পর্যটকদের দুশ্চিন্তায় ফেলে। যদিও বেশিরভাগ সমস্যাই পর্যটন রুটের বাইরে সীমাবদ্ধ।

তবুও পর্যটন খাতকে অনেকেই দেখছেন সম্ভাবনার আলো হিসেবে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। ফাহাদ আহমেদের মতে, পর্যটন বাড়লে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হবে। গ্রামাঞ্চলে হোমস্টে, গাইড, ইকো-রিসোর্ট; সবকিছুতেই স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবে। শ্রীমঙ্গলে চা-বাগান ঘিরে গড়ে উঠছে কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন। সুন্দরবনের আশপাশে স্থানীয়রা গাইড হিসেবে কাজ করছেন। এই উদ্যোগগুলো শুধু পর্যটন নয়, টেকসই উন্নয়নের পথও দেখাচ্ছে।

সবমিলিয়ে, বাংলাদেশে পর্যটনের মূল বাধা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভাব নয় বরং দেশের ইতিবাচক দিক সঠিকভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে না ধরা। সঠিক পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ও ইতিবাচক গল্প বিশ্বদরবারে পৌঁছাতে পারলে বাংলাদেশও একদিন দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ/উ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft