
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সহিংস অপরাধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অপরাধ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দেশে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ (আইস)-এর মতো সিনথেটিক মাদক সেবনের ফলে অপরাধীদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীন আগ্রাসন, হিংস্রতা ও হিতাহিত জ্ঞান হারানোর প্রবণতা বাড়ছে, যা নারী ও শিশু নির্যাতন থেকে শুরু করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর একাধিক শিশুকে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত অনেক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অভিযুক্তদের মাদকাসক্তির তথ্য উঠে এসেছে।
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী সাত বছরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত সোহেল রানা ইয়াবাসক্ত ছিলেন বলে তদন্তে জানা গেছে। একইভাবে যশোরের শার্শায় তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার আলম গাজীর বিরুদ্ধেও পূর্বে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মাদক সেবনের পরই তারা শিশুদের টার্গেট করতেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুর, জেনেভা ক্যাম্প, বছিলা, মিরপুর, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কামরাঙ্গীরচর ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলোর বড় অংশই মাদকাসক্ত। এসব গ্যাং ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা ও সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও কুপিয়ে হত্যার মতো ঘটনাতেও মাদকের প্রভাব স্পষ্ট।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ইয়াবা ও আইস মানুষের স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে হ্যালুসিনেশন, অস্বাভাবিক উত্তেজনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানো এবং সহিংস আচরণের প্রবণতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি যৌন সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকাসক্তদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাওয়ায় তারা সহজেই ধর্ষণ, হত্যা কিংবা অন্য নৃশংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
মাদকের সামাজিক প্রভাবও ভয়াবহ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাদকের টাকার জন্য বাবা-মা, স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি ও দখলবাজির ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নয়, দেশের অর্থনীতি ও মানবসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেছেন, মাদকের কারণেই হত্যা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধ বাড়ছে। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, আইসসহ সব ধরনের মাদক প্রবেশ বন্ধ না করা গেলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তবে মাদক নির্মূলে সরকারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক দল, সচেতন নাগরিক ও অভিভাবকদেরও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক কারবারি ও মাদকাসক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, সীমান্ত নজরদারি জোরদার, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।