তেইশ কেজির জীবন যাদের
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ২:৪৫ পিএম

সকালে ঘুম ভাঙার পর চায়ের পেয়ালায় চুমুক না দিলে আমাদের অনেকের সকালই শুরু হয় না। শুধু কি তাই? সারাদিন ঘরে-বাইরে চা, অতিথি আপ্যায়নে চা, গল্পে-আড্ডায় চা। চা আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। চা ছাড়া যেন আমাদের চলেই না! কিন্তু এই চা উৎপাদনে যারা কঠোর পরিশ্রম করেন, তাদের জীবনযাপন কেমন? না, তাদের জীবন খুব স্বাচ্ছন্দ্যের নয়। সারাদিন রোদে পুড়ে বাগানে যে শ্রমিকরা চা পাতা সংগ্রহ করেন, তাদের অধিকাংশই নারী শ্রমিক। দৈনিক আট ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করে তেইশ কেজি পাতা তুললে তারা মজুরি পান মাত্র ১৭৮ টাকা। আবার এই পাতা তোলা তেইশ কেজির কম হলে দৈনিক মজুরি থেকে সাত টাকা মাইনাস হয়ে যায়। এরপর যা থাকে তা দিয়েই চলে চা শ্রমিকদের সাংসারিক খরচ। কিন্তু কেমন চলে ওই সামান্য আয়ে এই দুর্মূল্যের বাজারে তাদের জীবনযাপন, চলুন জেনে নিই তাদের মুখ থেকেই।

শীতের সকাল। ঘন কুয়াশা কেটে গিয়ে সূর্য উঁকি দিয়েছে। সকাল গড়িয়ে বেলা গেছে দুপুরের কাছাকাছি। চা বাগানের গাছগুলোতে সবুজ কচি পাতার ওপর রোদ পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। সবুজ বাগানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চা পাতা তুলছেন নারী শ্রমিকরা। দূর থেকে দেখে মনে হয় সবুজ পাতার ওপর রঙিন ফুল। যদিও তাদের জীবন বাস্তবতার কঠিন আঘাতে জর্জরিত। বাগানের পাতা তোলা হয়, আবার নতুন পাতা গজায়। কিন্তু বদলায় না শ্রমিকদের জীবন। বছরের পর বছর তারা একই রকম থেকে যায়। সকালে আসে কাজে। সারাদিন পাতা তোলে, বিকালে গাড়ি এসে পাতা মেপে নিয়ে যায়। সপ্তাহ শেষে বিল পায়। দু-তিন দিন সে টাকায় সংসারের বাজার সদাই হয়। পরের কয়েকদিন চলে ধাক্কায়। যুগ যুগ ধরেই এভাবে চলছে তাদের জীবন। কেদারপুর চা বাগানে দেখা হয় রত্না পলের সঙ্গে। দ্রুত হাতে চা পাতা তুলে কাঁধে ঝোলানো থলেতে ফেলছেন। তার পরনে পুরনো ছাপার শাড়ি। তার ওপর রঙ জল যাওয়া সোয়েটার। পেছনের ঝোলাটাও ছেঁড়া রঙ চটে যাওয়া। এক মনে কাজ করছেন। বুঝলাম কথা বলে সময় নষ্ট করার সময় তার হাতে নেই। তবু পাশে দাঁড়িয়ে কেমন আছেন জানতে চাইলে হাসলেন। সকালে নাশতা খেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে বললেন, চা-মুড়ি খেয়ে কাজে আসছেন সকাল আটটায়। তবে সঙ্গে ভাত নিয়ে আসছেন। দুপুরে খাবেন। তরকারি কী জানতে চাইলে বললেন, তেমন কিছু না। আছে শাক-পাতা। বাগানে কাজ করে যা মজুরি পান তা দিয়ে সংসার চলে কিনা জানতে চাইলে বললেন, তার তিন ছেলেমেয়েসহ বাড়িতে মানুষ মোট পাঁচজন। স্বামী বাগানের সর্দার। দুজনের আয়েও এই দুর্মূল্যের বাজারে সংসার চালানো বেশ কঠিন। সন্তানদের দুধ-ডিম তো দূরে থাক, দুই বেলা মাছ-ভাত দিতেও পারেন না ঠিকমতো। সপ্তাহে দুই দিন মির্জাপুর বাজারে গিয়ে বাজার করে আনেন। বাজারে যাওয়া-আসায় ত্রিশ টাকা গাড়ি ভাড়া লাগে। এত ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন তো আর যাওয়া যায় না। তাই দুই দিন বাজার করে তারা পুরো সপ্তাহ চালিয়ে দেন।

আরও পড়ুন : বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে খালেদা জিয়ার ৪১ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পথচলা

ভাড়াউড়া চা বাগানে দেখা হয় সাবিত্রীর সঙ্গে। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। সারাদিন কাজ শেষে মাথায় লাকড়ির বোঝা নিয়ে যাচ্ছিলেন। কথা বলতে চাইলে দাঁড়ালেন। কত বছর ধরে বাগানে কাজ করছেন জানতে চাইলে বললেন, ম্যালা দিন। হিসাব জানি না। কাজ করে যে মজুরি পান তাতে সংসার কেমন চলে জানতে চাইলে সাবিত্রী বলেন, আমাদের সংসার আর কি চলে! দুই বেলা পেটে খাবার পড়ে আর কী। একবার ভাত খাই, আরেকবার রুটি। কী দিয়ে খাই সেটা মুখ ফুটে বলার মতো নয়। শাকসবজি পাইলে খাই। মাছ- মাংস তেমন কিনতে পারি না। মাসে দু-তিন দিন কিনি হয়তো। ঘরে খাবারের মুখ তো বেশ কয়েকজন। স্বামী মারা গেছে বছরখানেক আগে। এক ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়ে বিয়ে করে চলে গেছে। ছেলে বাগানে সর্দারের কাজ নিয়েছে। ছেলের ঘরে দুই সন্তান। বউ কাজ করে না। তার পায়ে সমস্যা আছে। তাই ঘরে থেকে সন্তানদের দেখাশোনা করে। সাবিত্রী বলেন, মা আর ছেলে দুজন কাজ করে যা পাই তাই দিয়ে পাঁচজন মানুষের পেট ভরাতে হয়। নতুন কাপড় মানে বছরে একবার পূজার সময় কেনা হয়। দিনারপুর চা বাগানে দেখা হয় পার্বতীর সঙ্গে। বয়স ১৩ বছর। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছে সে। কিন্তু অভাবের সংসারে খাবার জোটে না। তাই গত বছর থেকে বাগানে কাজে লেগেছে। সে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। মজুরি ১৭৮ টাকা পেলেও স্থায়ী শ্রমিকদের মতো সব সুবিধা পায় না। দুপুরে কী খাবে জানতে চাইলে বলল, ভাত আর পেঁয়াজ-মরিচ নিয়ে এসেছি। কচি চা পাতা ভর্তা করে ভাত দিয়ে খাবে।

বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা বড় অংশ চা বাগানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী। চা বাগানের শ্রমিকরা তাদের পরিবার নিয়ে বাগানের লাইন বা কলোনিতে বাস করেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি, ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকা, পুষ্টিকর খাবারের অভাবসহ নানারকম সমস্যায় জর্জরিত তাদের জীবন। চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানরা একটা নির্দিষ্ট সময় পর নিজেরাও বাবা-মায়ের সঙ্গে চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে তাদের জীবনধারা। সূত্র : আমাদের সময়।

জ/উ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft