বাঞ্ছারামপুরে বাণিজ্য মেলায় উপচে পড়া ভীড়
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫, ১২:৩৬ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে এ বছর যে মাসব্যাপী শিল্পপণ্য ও বাণিজ্য মেলা চলছে, তা যেন শুধু বাণিজ্যের আঙিনা নয়-এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর মানুষের জীবনরঙের এক জমাট প্রদর্শনী। পৌরসভার ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন মাঠে নেক্সুরা ট্রেডিং কর্পোরেশনের আয়োজনে ১ নভেম্বর শুরু হওয়া এই মেলায় প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামছে। শুক্র-শনিবার সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ মনে হয়, যেন কোনো প্রাচীন সভ্যতার উৎসবে সময়চক্র ভেঙে উপস্থিত হয়ে পড়েছি।

সরেজমিনে দেখা যায়, হোমনা, তিতাস, মেঘনা, নবীনগর, মুরাদনগর, আড়াইহাজার ও মাধবদীর মানুষ এক অদ্ভুত টানেই ছুটে আসছেন - ঠিক যেমন মানুষ মোগল আমলে হাট-বাজারে জড়ো হতো, যেখানে বাণিজ্যের সাথে মিলেমিশে থাকত গল্প-সংস্কৃতি-মানুষের হাহাকার আর হাসি। প্রতিদিন লাখো টাকার পণ্য বিক্রি হচ্ছে, আর প্রতিটি স্টলের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, বাজার নয়, যেন যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা মানুষের বিনিময়যজ্ঞ।

আরও পড়ুন : সরাইলে জমি নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৩০

আয়োজক মীর মোশাররফ হোসেন বকুল জানালেন, বিভিন্ন জেলা থেকে ৭০টি স্টল ও চারটি প্যাভিলিয়ন অংশ নিচ্ছে - নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, ফার্নিচার, পোশাক, প্রসাধনী - সব মিলিয়ে যেন এক আধুনিক বণিকসমাজের প্রতিচ্ছবি। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ড্রাগন ট্রেন, নৌকা, গেম জো - এগুলো দেখে মনে হয়, ঐতিহাসিক মেলা সংস্কৃতি কীভাবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে নবায়ন করে। আর খাবারের স্টলগুলো - ফুচকা, চটপটি, তান্দুরি চা - এগুলো তো সরাসরি স্থানীয় স্বাদ-সংস্কৃতির জীবন্ত ফসিল, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের আড্ডার অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।

শনিবার (১৫ নভেম্বর) মেলাভবন ঘুরে দেখা গেল - কিছু স্টলে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ভিড় শুধু কেনাকাটার জন্য নয়; এটা মানুষের মনোজগতে মেলার প্রতি বহুদিনের টান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মেলা ঘুরে দেখা - যা বাঙালি সমাজে বারবার ফিরে আসে। শীত উপেক্ষা করে সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে মানুষের ভিড় দেখে মনে হয় - যে সমাজে দিনযাপন কঠিন, সেখানে মেলা মানে একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ, একটু স্মৃতির আশ্রয়।

আরও পড়ুন : কুমিল্লায় নাশকতার চেষ্টা, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৪৪ নেতাকর্মী আটক

শীতের পোশাক, গৃহস্থালী সামগ্রী, খেলনা, নারীদের পণ্য - সব স্টলে প্রচণ্ড ভিড়। ইলেকট্রনিক্স, প্লাস্টিকের সামগ্রী, রান্নার পণ্য - সবই রয়েছে বাণিজ্য ইতিহাসের আধুনিক রূপ। ব্লেজার বিক্রির ছোট স্টলে গিয়ে দেখা যায় - মানুষ ঠাসাঠাসি, ঠিক যেন প্রাচীন বাজারের মতো। বিক্রয়কর্মীদের ব্যস্ততা দেখে চেনা যায় - যে মেলা এখনও মানুষের কাছে আনন্দ-উৎসবের স্মারক।

পরিবার নিয়ে আসা হোমনার মামুন বললেন - বাচ্চাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য আসা, নবীনগরের শিক্ষক সালমা বেগম জানালেন, পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরে দেখা আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা। কলেজছাত্র আসিফের কাছে মেলা মানে - বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটা, আড্ডা, হাসাহাসি। এটাই তো মেলা - সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের মিলনমাঠ।

আরও পড়ুন : কুমিল্লায় নাশকতার চেষ্টা, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৪৪ নেতাকর্মী আটক

বিক্রেতারাও খুশি। আবদুর রহমান বললেন - শুক্র-শনিবার মানুষ বেশি আসবেই; কিন্তু এবার ভিড় প্রত্যাশারও বাইরে। খেলনা বিক্রেতা জহির আহমেদ বললেন - মেলার সৌন্দর্যই হলো মানুষ। আর এই উপস্থিতি প্রমাণ করে - বাণিজ্য মেলা শুধু বেচাকেনার আয়োজন নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে।

দর্শনার্থী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মেলা স্থানীয় অর্থনীতিতে যেমন গতি আনবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাঙালি সংস্কৃতির চলমান ধারাকেও জীবন্ত রাখবে - একদিকে আধুনিক বাণিজ্যের দাপট, অন্যদিকে শেকড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গন্ধ - দুটোই এই মেলায় পাশাপাশি হাঁটে।

জ/উ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft