
বড়াল নদীর ৫ কিলোমিটার অংশে অযাচিতভাবে ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বড়াইগ্রামের বনপাড়া পৌরসভা। নদী কমিশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতির তোয়াক্কা না করে নদীর এই অংশে নামমাত্র ড্রেজিং করা হচ্ছে। ড্রেজিংয়েও রয়েছে নানা অনিয়মের অভিযোগ।
এতে করে নদীটির নামকোয়াস্ত যে স্মৃতি চিহৃ ছিল, তাও এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে। অথচ ৫২৮ কোটি টাকা ব্যায়ে বড়াল নদী দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি নিষ্কাশনের নামে এভাবে নদী শাসন করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
বড়াল নদী ড্রেজিংয়ের এই প্রকল্পের সঠিক তথ্য সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেনি পৌর কর্তৃপক্ষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রমত্তা বড়াল পদ্মায় জন্ম নিয়ে যমুনায় বিলিন হয়েছে। ২২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই নদীর পেট চিরে জন্মেছে নদী-নালা, খাল-বিল। পদ্মা-যমুনার পানি এই নদী হয়েই গড়িয়ে পড়তো দেশের সর্ববৃহৎ চলনবিলে। অথচ ৫’শ ফিট প্রস্থের এই নদীর বনপাড়া অংশ দখল-দূষণে সরু হয়ে গেছে।
পৌরসভার বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ‘বি এম ডবিøউ এস এস পি’ প্রকল্পের আওতায় এই বড়ালের বনপাড়া হাওড়া মিঠুর বাড়ি থেকে নটাবাড়িয়া বকুলতলা পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার সংস্কারের উদ্যোগ নেয় বনপাড়া পৌরসভা। এর সঙ্গে হাওরা থেকে বিলচিনিডাঙ্গা পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার জিয়া খালও সংস্কার করা হচ্ছে। কাজটি শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল। ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয়ের এই কাজটি পেয়েছে নাটোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এ্যান্ড কোং।
বনপাড়া পৌরসভার উপ সহকারি প্রকৌশলী রিপন কুমার শিল বলেন, বড়াল নদী ড্রেজিংয়ের কথা তাদের প্রকল্পে উল্লেখ নেই। মূলত পৌর শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য তারা বাধ্য হয়ে বড়ালের ৫ কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং করছেন। নদী ড্রেজিংয়ের জন্য নদী কমিশন বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি নেয়নি পৌরসভা।
তিনি বলেন, বড়াল নদী হলেও এটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। একারণে পৌরসভার প্রকল্পে কোথাও কোথাও ৩ ফিট গভীর ও ২ ফিট প্রস্তেও খনন কাজ করছেন তারা।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিফাত করিম বলেন, বনপাড়া পৌর কর্তৃপক্ষ বড়ালের ৫ কিলোমিটার ড্রেজিং করছে। এই বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তবে এ বিষয়ে পৌরসভা পানি উন্নয়ন বের্ডের বা নদী কমিশনের অনুমতি নেয়নি।
তিনি বলেন, ৫২৮ কোটি টাকা ব্যায়ে বড়াল ও নারদ নদী দখলমুক্ত করে খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের পরও পৌরসভার বড়াল নদী ড্রেজিংয়ে বিষয়টি তার বোধগম্য নয়।
বড়াল তীরের বাসিন্দা কালিকাপুর বেড় পাড়া মহল্লার বাসিন্দা আব্দুস সালাম, লুৎফর রহমান ও রাজু আহম্মেদ বলেন, তারা পৃর্ব পুরুষের মুখে বড়াল নদীর নাম শুনেছেন। সেই নদী তীরেই তাদের বসতি। এই এলাকায় নদী খনন করা হয়নি। মূলত খননের নামে কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়েছে। বড়ালকে দখলমুক্ত করে নাব্যতা ফেরানোর দাবি তাদের।
কালিকাপুরের গায়রুদ্দিন মোল্লা ও জান মোহাম্মদ বলেন, পৌরসভা কী বড়াল নদী ড্রেসিং করতে পারে? নদীটি খননের দাবি তাদের। কিন্তু পৌরসভা পানি নিষ্কাশনের নামে বড়ালের মতো বৃহৎ নদীকে খাল বানাচ্ছে। তারা পৌরসভার এই খামখেয়ালীপনার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
স্থানীয় কলেজ শিক্ষক আব্দুল মালেক ও মিজানুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, বড়াল একটি ঐতিহ্যবাহি খরস্রোতা নদী। নদীটি বনপাড়া পৌরসভার বুক চিরে বয়ে গেছে। ১৯৮৪ সালে বড়ালের উৎস্যমুখে সরু সুইচগেট নির্মাণ করে নাব্যতা নষ্ট করা হয়। এরপর থেকে বনপাড়া শহর এলাকায় বড়াল দখল করে বসতি গড়ে উঠেছে। ১০ ফিট প্রস্তের খালে পরিণত হয়েছে ৫শ ফিট প্রস্তের বড়াল নদী। তারপর আবার নদীকে ড্রেনের মতো করে ড্রেজিং করছে পৌরসভা। সেই ড্রেজিংয়েও নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে।
এ ব্যপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মো. আসিফ নামের এক ব্যক্তির সাথে কথা হয়। তিনি বড়াল নদী ড্রেজিংয়ের ব্যপারে পৌরসভার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বড়াইগ্রাম উপজেলার যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সবুজ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়ে বিএনপির লোকজন কাজটি বাস্তবায়ন করছে। প্রভাবখাটিয়ে নামমাত্র খনন করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো হয়েছে। অথচ পৌরসভা বড়াল নদীতে হাত দিতে পারে না। মূলত বড়ালে ড্রেজিং না করে ওই বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করা যেত। কিন্তু পৌরসভা তা না করে নদী ড্রেজিংয়ের নামে অর্থ আত্মসাৎ করছে।
এসব বিষয় নিয়ে বনপাড়া পৌরসভার প্রশাসক বড়াইগ্রামের সহকারি কমিশনার (ভূমি) আশরাফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বড়াল নদীতে পৌরসভার পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের ব্যপারে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রকল্পের তথ্য দিতেও অসহযোগীতা করেন।