
গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানে ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুর জেলার প্রধান নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে তীর উপচে পড়েছে। সীমান্তবর্তী এ জেলার নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার বৃহৎ অংশ এবং নকলা উপজেলার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে পানি বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বসতবাড়িতে ঢুকে পড়েছে, তলিয়ে গেছে আমন ধানক্ষেত, বীজতলা ও সবজিক্ষেত। এতে শত শত কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালি এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর পানি সমতলে প্রবেশ করা শুরু করে। ঝিনাইগাতীর মহারিশি নদীর পূর্বের ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে ঢুকে তীব্র স্রোতে উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া-গোমড়া গ্রামে নদীর তীরবর্তী সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া অনেকের বসতঘরের ভিটা ভেঙে গেছে এবং উপজেলা সদর বাজারে পানি ঢুকে পড়ে। সোমেশ্বরী ও পাগলা নদীর পানি বেড়ে ধানশাইল ইউনিয়নের বাগের ভিটা, কাড়াগাঁও ব্রিজ এলাকা হয়ে দাড়িয়ারপাড় ও সারিকালীনির গ্রামের বিলে প্রবেশ করে।
অন্যদিকে পার্শ্ববর্তী শ্রীবরদী উপজেলার রানিশিমুল ইউনিয়নের চক্রপুর, বড়ইকুচি, হাতিরবরসহ কয়েকটি গ্রামেও পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করে। এছাড়াও নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তীরবর্তী বসতবাড়ি প্লাবিত হয়। ভোগাই নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে আমন বীজতলা, আগাম ধানক্ষেত ও সবজিক্ষেত নষ্ট হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইতিমধ্যে পানি কমতে শুরু করেছে। ভোগাই ও চেল্লাখালি নদীর পানি কমতে থাকলেও বিভিন্ন জায়গায় ভাঙনের দেখা দিয়েছে। ভোগাই নদীর উত্তর কোন্নগর, ভোগাইপাড়, দক্ষিণ কোন্নগর, ফকিরপাড়া, বেনীরগোপ, ধনাকুশা নদীর পাড় ইত্যাদি এলাকায় পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে পাড়ে ভাঙনের দেখা দিয়েছে।
চেল্লাখালী নদীর পানির তোড়ে শেরপুর-নালিতাবাড়ী ভায়া গাজিরখামার সড়কের গোল্লারপাড় এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে অবশিষ্ট ৬-৭ ফুট প্রশস্ত সরু অংশ দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে শুধু ছোট যানবাহন চলাচল করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংস্কার না হলে পরবর্তী পাহাড়ি ঢলে সড়কটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিও আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এলজিইডি সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় প্যালাসাইডিং এবং পরে সিসি ব্লক নির্মাণ করা হলেও চলতি বর্ষার জুন মাসের পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবার প্যালাসাইডিংয়ের পাশাপাশি ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কের অন্তত ১২ ফুট ধ্বসে গেছে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাকিল আহমেদ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী, নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল মালেক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জেলা প্রশাসক দ্রুত সংস্কার ও ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন ।
ঝিনাইগাতী উপজেলার গোমড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, অনেক কষ্টে সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করি। পাহাড়ি ঢলের পানিতে ইতোমধ্যে এলাকায় সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর ভাঙন যেভাবে বাড়ছে, তাতে আবাদি জমি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের বাঁচাতে নদীর স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন বলেন, 'পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার কারণে নদীর তীরবর্তী কৃষি জমির সবজিসহ নানা ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কৃষকদের রক্ষা করতে হলে নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন করতে হবে। একইসঙ্গে খালগুলো পুনঃখনন করা প্রয়োজন, যাতে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হতে পারে।'
নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, 'এই উপজেলায় এখনো আমন ধান রোপণ শুরু হয়নি, বীজতলার তেমন ক্ষতি হয়নি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের পাশে রয়েছেন।'
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার, ভোগাই নদীর পানি নাকুগাও পয়েন্টে ৩০৮ সেন্টিমিটার ও নালিতাবাড়ী পয়েন্টে ২৭০ সেন্টিমিটার এবং সদর উপজেলার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৩৮৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ঝিনাইগাতী উপজেলার মহারশি ও সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী বলেন, উজানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে শেরপুরে নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছিল , বৃষ্টিপাত ইতোমধ্যে কিছুটা কমেছে। নদনদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দিলে জরুরি মেরামতের জন্য জিও ব্যাগ প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।
শেরপুর জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাকিল আহমেদ দৈনিক জবাবদিহিকে বলেন, জেলার প্রত্যেক উপজেলায় দুর্যোগ মোকাবেলায় কমিটি সক্রিয় রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।
জ/দি