
দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ডের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হত্যার ঘটনা ঘটছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আগের মতো তাৎক্ষণিক বিরোধের পাশাপাশি এখন পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং, প্রকাশ্যে নৃশংস হামলা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাইয়ে বাধা এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আসছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে, এই তিন মাসেই দেশে ৯১৫টি হত্যা মামলা হয়েছে। মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটছে। একই সঙ্গে বছরের প্রথম প্রান্তিকে হত্যার মামলা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা টার্গেট কিলিং। মোটরসাইকেলে এসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে গুলি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। হামলাকারীরা হেলমেট ও মাস্ক ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়িক বিরোধ, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার কিংবা পূর্বশত্রুতার জেরেই অধিকাংশ টার্গেট কিলিং সংঘটিত হচ্ছে।
শুধু টার্গেট কিলিং নয়, প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় এক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দিনের আলোয় সংঘবদ্ধভাবে হামলার দৃশ্য জনমনে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তদন্তে ব্যবসায়িক বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্যের বিষয় সামনে আসে।
অন্যদিকে রাজধানী ও বিভিন্ন জেলা শহরে ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় হত্যা নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল কিংবা টাকা ছিনিয়ে নিতে বাধা দিলেই হামলাকারীরা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করছে। একইভাবে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ডাকাতির সময় হত্যার ঘটনাও বাড়ছে।
উদ্বেগজনক আরেকটি দিক হলো পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের বৃদ্ধি। পুলিশ সদর দপ্তরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত হত্যার বড় অংশই পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে ঘটেছে। একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬০৫টি হত্যার মধ্যে ৩৩৬টি পূর্বশত্রæতা, ১৪৬টি পারিবারিক বিরোধ, ৬৯টি সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধ, ৯টি আধিপত্য বিস্তার এবং ৬টি ডাকাতির সময় সংঘটিত হয়েছে। সরাসরি রাজনৈতিক কারণে হত্যার সংখ্যা তুলনামূলক কম।
সাম্প্রতিক সময়ে নদী, খাল ও নির্জন স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রথমে নিখোঁজ হিসেবে জিডি হলেও পরে তদন্তে জানা যাচ্ছে, ভুক্তভোগী পরিকল্পিত হত্যার শিকার হয়েছেন। অপরাধীরা প্রমাণ নষ্ট করতে লাশ গুমের চেষ্টা করছে বলেও তদন্তকারীরা মনে করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধের ধরন এখন অনেক বেশি সংগঠিত। স্থানীয় আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ, মাদক ব্যবসা এবং দুর্বল সামাজিক নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে কাজ করছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধ, দ্রুত বিচার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি জোরদার করতে হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এনামুল হক সাগর বলেছেন, “ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আলোচিত অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হত্যাকাণ্ডের বর্তমান ধারা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অপরাধীরা আগের তুলনায় আরও সংঘবদ্ধ, প্রযুক্তি-সচেতন এবং সহিংস হয়ে উঠেছে। অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, মাদক অর্থনীতি, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় আধিপত্যের রাজনীতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তাই শুধু অপরাধ সংঘটনের পর অভিযান নয়, বরং গোয়েন্দা নজরদারি, দ্রুত বিচার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, কমিউনিটি পুলিশিং এবং সামাজিক প্রতিরোধ সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।
দেশের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের চিত্র বলছে, অপরাধের কৌশল বদলেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ করা।