
সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত দিন দিন হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সাগরের জোয়ারের প্রবল ঢেউ, উপকূল ভাঙন এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় সৈকতের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোথাও বালু সরে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও ছড়িয়ে রয়েছে জীর্ণ জিও ব্যাগ ও জিও টিউব। এতে পর্যটকদের নিরাপদ চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কমছে সৈকতের নান্দনিকতাও।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, একসময় কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণ ছিল একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের সুযোগ। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সৈকতের বড় অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় সেই আকর্ষণও অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
তারা জানান, ২০০০ সালের পর থেকে কুয়াকাটা উপকূলে ভাঙন শুরু হয়। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। এরপর ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নতুন করে ক্ষয় দেখা দেয়। চলতি বছরও পশ্চিম মাঝিবাড়ি, ঝাউবন, গঙ্গামতি ও চর গঙ্গামতিসহ প্রায় পাঁচ কিলোমিটার উপকূল ভাঙনের কবলে পড়েছে। অনেক স্থানে বালু সরে গিয়ে মাটি বেরিয়ে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ২৫ বছরের ভাঙনে ইতোমধ্যে ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, শালবন, বিস্তীর্ণ ঝাউবন, ইকোপার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়েছে। গত বছর সাগরের ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৈকতসংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়ক। বর্তমানে ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স, মসজিদ, মন্দির, ট্যুরিজম পার্ক, ওয়াশরুমসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জোয়ারের সময় সৈকতের ওয়াকওয়েও পানিতে তলিয়ে যায়।
পর্যটকরা জানান, একসময় বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় হাঁটাহাঁটি ও সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত উপভোগ করা গেলেও এখন অনেক জায়গায় চোখে পড়ে জিও ব্যাগের স্তূপ। এতে কুয়াকাটার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ আগের তুলনায় কমে গেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে সৈকতের নান্দনিকতা নষ্ট হলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতিতে। তারা সৈকত রক্ষায় দ্রুত গ্রোয়েন বাঁধসহ স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
পর্যটনকর্মী জনি আলমগীর বলেন, প্রতি বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন সৈকত রক্ষা। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
কুয়াকাটা ক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় এই সৈকত রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ভুল নকশা ও পরিকল্পনার কারণে অতীতের বেশ কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদন পায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে জিও ব্যাগ ব্যবহার কিছুটা কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উপকূল ব্যবস্থাপনা ছাড়া কুয়াকাটা রক্ষা সম্ভব নয়। এজন্য বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, নিয়মিত ড্রেজিং, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং উপকূলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
এ বিষয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ভাঙনরোধে অস্থায়ীভাবে বালুভর্তি জিও টিউব স্থাপনের কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের ভাঙন স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জ/দি