
যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান এবং সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে লালমনিরহাটে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাত জোড়া যৌতুকবিহীন গণবিবাহ। 'আলোকিত লালমনিরহাট' কমিটির উদ্যোগে শুক্রবার রাতে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে লালমনিরহাট সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সাতজন বর ও সাতজন কনে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের যাবতীয় ব্যয় বহন করে আয়োজক কমিটি।
শুক্রবার সন্ধ্যা গড়াতেই জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে ভিড় করতে শুরু করেন বর-কনের স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। উৎসবমুখর পরিবেশে একে একে মঞ্চে ওঠেন সাত জোড়া বর-কনে। এরপর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ের আয়োজন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত পরিবেশন করেন স্থানীয় শিল্পীরা। লোকসংগীতের সুর, করতালি, হাসি আর শুভকামনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন। নতুন জীবনের সূচনায় উচ্ছ্বাসে ভাসেন নবদম্পতি ও তাদের পরিবার।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী এবং আলোকিত লালমনিরহাট কমিটির প্রধান উপদেষ্টা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল হক প্রধান, জেলা পরিষদের প্রশাসক এ কে এম মমিনুল হক, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
নবদম্পতি আলমগীর হোসেন বলেন, যৌতুক ছাড়া বিয়ে করতে পেরে আমি গর্বিত। আমরা চাই সমাজ থেকে এই কুপ্রথা চিরতরে বিদায় নিক। ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতেই একটি সুন্দর সংসার গড়ে ওঠে।তার স্ত্রী তামান্না খাতুন বলেন, আমার বাবা-মাকে বিয়ের জন্য কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। এত সুন্দর ও সম্মানজনক পরিবেশে আমার বিয়ে হবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। এই দিনটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে।
আরেক বর সমর চন্দ্র রায় বলেন, যৌতুকের কারণে অনেক পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে। যৌতুকবিহীন বিয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান হবে।সমরের স্ত্রী বিথী রানী বলেন, কোনো আর্থিক চাপ ছাড়াই সম্মানের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পেরে আমরা খুবই আনন্দিত। সমাজের প্রতিটি মেয়েই যেন এমন সম্মানজনক পরিবেশে বিয়ে করতে পারে।
বিথীর বাবা দীনেশ চন্দ্র রায় বলেন, মেয়ের বিয়ের জন্য যৌতুকের টাকা জোগাড় করতে না পেরে খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আলোকিত লালমনিরহাট আমাদের সেই দুশ্চিন্তা দূর করেছে। সমাজে এমন উদ্যোগ বাড়লে কোনো বাবাকেই মেয়ের বিয়ে নিয়ে অসহায় হতে হবে না।প্রধান অতিথির বক্তব্যে ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, যৌতুক আমাদের সমাজের অন্যতম বড় সামাজিক ব্যাধি। এর কারণে নারী নির্যাতন, পারিবারিক কলহ ও নানা সামাজিক সংকট তৈরি হয়। যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। আলোকিত লালমনিরহাটের এই আয়োজন শুধু সাতটি বিয়ে নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী বার্তা।
তিনি আরও বলেন, যখন একটি পরিবার যৌতুকমুক্ত হয়, তখন সম্পর্কের ভিত্তি হয় ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। লালমনিরহাট থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ুক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, যৌতুকবিহীন গণবিবাহ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা বহন করে।
এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত আয়োজন করা হলে যৌতুকের মতো কুপ্রথা নির্মূলে জনসচেতনতা বাড়বে এবং মানবিক, বৈষম্যহীন ও সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত, নবদম্পতিদের শুভেচ্ছা, অতিথিদের আপ্যায়ন এবং আনন্দঘন আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ব্যতিক্রমী এই গণবিবাহ। তবে শেষ হলেও থেকে যায় একটি শক্তিশালী বার্তা- যৌতুক নয়, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানই হোক প্রতিটি বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তি।