হোলি আর্টিজানের এক দশক
রক্তাক্ত সেই রাতের ক্ষত কি শুকিয়েছে, নাকি জঙ্গিবাদ শুধু বদলেছে তার রূপ?
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ৯:২১ পিএম

দশ বছর পেরিয়ে গেছে। রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে এখন আর নেই সেই পরিচিত হোলি আর্টিজান বেকারি। পুরোনো ভবনের জায়গায় উঠেছে নতুন স্থাপনা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ওই সড়ক দিয়ে হেঁটে যান, যানবাহন ছুটে চলে আগের মতোই। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে চাপা পড়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার স্মৃতি।

২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই রাত শুধু ২২টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ভাবনা, জঙ্গিবাদ মোকাবিলার কৌশল এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান। প্রথমবারের মতো বিশ্বের শিরোনামে উঠে আসে বাংলাদেশ—একটি ভয়াবহ জঙ্গি হামলার কারণে।

এক দশক পরও সেই হামলার বিচার চূড়ান্ত হয়নি। নিহতদের পরিবার এখনো অপেক্ষা করছে চূড়ান্ত রায়ের জন্য। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, বড় জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা- জঙ্গিবাদ কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না; সময়ের সঙ্গে শুধু তার কৌশল ও চেহারা বদলে যায়।

এই বাস্তবতায় হোলি আর্টিজানের দশম বার্ষিকী শুধু অতীত স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং নতুন করে মূল্যায়নের সময়—সেই ঘটনার শিক্ষা বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পেরেছে?

যে রাত বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশকে

২০১৬ সালের ১ জুলাই, শুক্রবার। রমজান মাসের শেষ দিকে ইফতারের পর রাজধানীর ক‚টনৈতিক এলাকা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের স্বাভাবিক আড্ডা চলছিল। কেউ পরিবারের সঙ্গে নৈশভোজে, কেউ ব্যবসায়িক বৈঠকে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন।
রাত প্রায় পৌনে নয়টার দিকে সবকিছু বদলে যায়।

অস্ত্র, চাপাতি ও বিস্ফোরক হাতে পাঁচ তরুণ রেস্তোরাঁয় ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে সবাইকে জিম্মি করে। আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু হয়। বাইরে গুলির শব্দ শুনে আশপাশের মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ।

খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ঢাকা মহানগর পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি, সোয়াট ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
প্রথম দিকে পুলিশ জিম্মিদের উদ্ধারের চেষ্টা করলে জঙ্গিদের গুলি ও বিস্ফোরণে নিহত হন গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। আহত হন আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য।

সারা রাত টেলিভিশনের পর্দায় ছিল উৎকণ্ঠার সংবাদ। হাসপাতালের সামনে, পুলিশ ব্যারিকেডের বাইরে এবং রেস্তোরাঁর আশপাশে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনেরা। কেউ জানতেন না, ভেতরে ঠিক কী ঘটছে। পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। কয়েক মিনিটের অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু অভিযান শেষে রেস্তোরাঁর ভেতরে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা বাংলাদেশের মানুষ আগে কখনো দেখেনি। নিহত অবস্থায় পড়ে ছিলেন ২০ জন জিম্মি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নয়জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় ও তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ মোট ২২ জনের প্রাণহানিতে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো দেশ।

সংখ্যার আড়ালে যাদের জীবন থেমে গেছে

হোলি আর্টিজান হামলার পর প্রায়ই উচ্চারিত হয় একটি সংখ্যা, ২২।

কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে রয়েছে ২২টি পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন আর অসীম বেদনার গল্প।

বাংলাদেশি তরুণ ফারাজ হোসেন বিদেশে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও বন্ধুদের ছেড়ে যাননি। সেই মানবিক সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।

নিহত হন অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ। প্রাণ হারান ভারতীয় নাগরিক তারিশি জৈন। জাপানের সাত নাগরিক বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ইতালির নয় নাগরিকের অনেকেই ব্যবসা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় কাজ করছিলেন।

তাঁদের মৃত্যু শুধু কয়েকটি পরিবারকে নয়, বাংলাদেশ-জাপান ও বাংলাদেশ-ইতালির দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

ধর্ম যাচাই করে হত্যা

তদন্তে উঠে আসে, হামলাকারীরা জিম্মিদের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করছিল।

যারা কোরআনের আয়াত বা সূরা পড়তে পেরেছিলেন, তাঁদের কয়েকজনকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে বিদেশি নাগরিকদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এই নৃশংসতা বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের ভয়াবহ আঘাত থেকে মুক্ত নয়।

পরিকল্পনা ছিল দীর্ঘদিনে

তদন্তে দেখা যায়, এই হামলা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্ত ছিল না।

কয়েক মাস ধরে গোপনে চলেছে সদস্য সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন, অস্ত্র সংগ্রহ এবং হামলার পরিকল্পনা।

গাইবান্ধার সাঘাটার একটি গোপন বৈঠকে ঢাকার ক‚টনৈতিক এলাকায় বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

তদন্তে কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি তামিম আহমেদ চৌধুরীকে হামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান। অস্ত্র ও অর্থের জোগান, আশ্রয় এবং লজিস্টিক সহায়তায় যুক্ত ছিলেন আরও কয়েকজন।

হামলার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল পাঁচ তরুণকে, যাদের অধিকাংশই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
এই ঘটনাই ভেঙে দেয় প্রচলিত ধারণা- জঙ্গিবাদ শুধু দারিদ্র্য বা অশিক্ষার ফল।
কেন বিদেশিদের টার্গেট?

তদন্তকারীদের মতে, হামলার উদ্দেশ্য ছিল বহুমাত্রিক।

প্রথমত, বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর কাড়া।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরা।

তৃতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ক‚টনৈতিক সম্পর্ককে আঘাত করা।

হামলার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই ছিল জঙ্গিদের অন্যতম লক্ষ্য।

হামলার পর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অভিযান

হোলি আর্টিজান হামলার পর বদলে যায় পুরো চিত্র। সারাদেশে শুরু হয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জঙ্গিবিরোধী অভিযান। নব্য জেএমবির একের পর এক আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নিহত হন সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। গ্রেপ্তার হন অসংখ্য সদস্য।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি), র‍্যাব, পুলিশ, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বিত অভিযানে কয়েক বছরের মধ্যেই জঙ্গি সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য সাংগঠনিক সক্ষমতা অনেকটাই ভেঙে পড়ে।
সরকার ঘোষণা করে ‘জিরো টলারেন্স টু টেররিজম’ নীতি।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়- অভিযানে জঙ্গি নেটওয়ার্ক দুর্বল হলেও, জঙ্গিবাদের মতাদর্শ কি সত্যিই নির্মূল হয়েছে?

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft