উৎকণ্ঠায় আরবান স্বাস্থ্য প্রকল্পের কর্মীরা: সরকারের জরুরী হস্তক্ষেপের দাবি
বেতন বকেয়া, ছাঁটাই, বদলি ও পদত্যাগের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:২৮ পিএম

আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার (ইউপিএইচসি) প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত হাজারো স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। বকেয়া বেতন, নীতিমালাবহির্ভূত বদলি, ছাঁটাই এবং পদত্যাগের চাপ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি করেছেন তারা।

কর্মীদের অভিযোগ, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা প্রকাশের আগেই বিভিন্ন এনজিও কর্তৃপক্ষ কর্মীদের এক সেন্টার থেকে অন্য  সেন্টারে বদলি করছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের মতামত না নিয়েই এসব বদলির আদেশ কার্যকর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে কর্মীদের মধ্যে চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এবং ব্যাপক হতাশার তৈরি হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সরকার আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রকল্পটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পরিচালনা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনা জারি করা হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ভুক্তভোগী কর্মীদের দাবি, কয়েক মাস ধরে বেতন বকেয়া থাকায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এর মধ্যেই নতুন নিয়োগপত্র বা সুস্পষ্ট প্রশাসনিক নির্দেশনা ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বদলির আদেশ দেওয়া হচ্ছে, যা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, আমরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছি, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বেতন পাচ্ছি না। আবার সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের আগেই আমাদের পদত্যাগপত্র দিতে মৌখিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এতে আমরা মানসিক ও আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েছি।

আরেক কর্মী বলেন, বদলির কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা আমাদের জানানো হয়নি। অনেককে হঠাৎ করেই এক সেন্টার থেকে অন্য সেন্টাওে বদলি করা হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার পরও নতুন নিয়োগপত্র ছাড়া এ ধরনের বদলি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ এনজিও কর্তৃপক্ষ কর্মীদের মতামত না নিয়েই জোরপূর্বক বদলি কার্যকর করছে।

কর্মীদের অভিযোগ, ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত আরবান স্বাস্থ্যকর্মীদের কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই ছাঁটাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু এনজিও নিজেদের পছন্দমতো নতুন কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যসেবা অব্যাহত রাখা এবং বিদ্যমান কর্মীদের চাকরি বহাল রাখার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানানো হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। এছাড়াও কিছু এনজিও কর্মীদের বিনা বেতনে কাজ করতে বাধ্য করছে। পাশাপাশি কর্মীদের জন্য চার লাখ টাকার আয়ের (ইনকাম) লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে বেতন কেটে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মীদের আশঙ্কা, এখানে যারা সেবা নিতে আসেন তারা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। এ ধরনের আয়ভিত্তিক লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের ওপর।

তারা আরও দাবি করেন, সরকার যেখানে স্বাস্থ্যসেবায় অধিক ভর্তুকিভিত্তিক ব্যয় নিশ্চিত করতে চায়, সেখানে কিছু এনজিও ৫০-৫০ ব্যয় মডেলের প্রস্তাব দিচ্ছে। এই মডেল বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন জনগণের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাবে, অন্যদিকে সেবাদানকারী কর্মীদের ওপরও অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হবে।

এদিকে কয়েকজন এনজিও প্রধান কর্মীদের জানিয়েছেন, সরকার নাকি আরবান স্বাস্থ্য প্রকল্পের দায়িত্ব এনজিওগুলোর হাতেই রাখবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, প্রকল্পটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেই পরিচালিত হবে। এই দুই ধরনের তথ্যের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে। তাই দ্রুত সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী, কর্মীদের বদলি, বেতন পরিশোধ এবং চাকরি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করেই হওয়া উচিত। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা বা আইনবহির্ভূত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় কর্মীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ, নীতিমালাবহির্ভূত বদলি ও ছাঁটাই বন্ধ, পদত্যাগে চাপ প্রয়োগ বন্ধ করা এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বিষয়ে সরকারের দ্রুত ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আরবান ফোকাল পারসনদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft