
সকাল থেকেই জামালপুরের মাদারগঞ্জের লালডোবা গ্রামের বাড়িতে নেমেছিল শোকের ছায়া। স্বজন-প্রতিবেশীরা এসে ভিড় করছিলেন। আঙিনায় তাঁবু, সারি সারি চেয়ার। আর বাড়ির পূর্ব পাশে চলছিল কবর খোঁড়ার কাজ। বিকালে এলো লাশ। সন্ধ্যায় জানাজা হলো লালডোবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। তারপর একে একে সবাই এলেন। শেষবারের মতো দেখলেন। কাঁদলেন। এরপর দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরঘুমে শায়িত হলেন জামিল আহমেদ লিমন। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, পিএইচডি শেষ করে এই মাটিতে ফিরবেন, এই মাটিই শেষ পর্যন্ত তাকে বুকে টেনে নিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় হত্যাকাণ্ডের শিকার বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী লিমন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের লালডোবা গ্রামের জহুরুল হকের ছেলে। কর্মসূত্রে জহুরুল হক দীর্ঘদিন গাজীপুরের মাওনা এলাকায় বসবাস করেন। সেখানেই লিমনের বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা। দুই ভাইয়ের মধ্যে লিমন ছিলেন বড়। ছোট ভাই জোবায়ের হোসেন। পরিবারের বড় সন্তানকে ঘিরে সবার অনেক স্বপ্ন ছিল, যা এখন শোকে রূপ নিয়েছে।
সোমবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, বাড়ির পূর্ব পাশে পারিবারিক কবরস্থানে কবর খোঁড়ার কাজ চলছিল। সেখানে লিমনের চাচা জিয়াউল হক বলেন, শান্ত স্বভাবের এই ছেলেটি আমাকে প্রায়ই বলত, ‘জ্যাঠা, আমার জন্য দোয়া করবেন যেন পড়াশোনা শেষ করে দেশের জন্য কিছু করতে পারি; বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে পারি।’ বিদেশে থাকাকালে সে বলেছিল, শিগগিরই দেশে ফিরবে। কিন্তু সেই ফেরা ফিরল লাশ হয়ে। তিনি বলেন, জ্যাঠা হয়ে ভাতিজার কবর খোঁড়া কতটা কষ্টের, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক লিমন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। ১৬ এপ্রিল তিনি নিখোঁজ হন। ২৪ এপ্রিল আবর্জনা ফেলার ব্যাগে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। একই সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টিও নিখোঁজ হন। লিমনের লাশ উদ্ধারের দুদিন পর তারও লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
দাদা-দাদির কবরের পাশে দাফন : মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, সোমবার বেলা সাড়ে ৩টায় লিমনের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এ সময় লিমনের আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার লাশ লালডোবা গ্রামে নিয়ে আসার খবর শুনে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীসহ লালডোবা ও আশপাশের গ্রামের লোকজন ভিড় করেন। লিমনে বাবা জহুরুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, লিমন আমার ছেলে, বৃষ্টিও আমার মেয়ের মতো। দুজনকেই আমার সন্তান মনে করে বলছি, ওদের যে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে এভাবে মরতে হলো, এটাতো কখনো কেউ আশা কেউ করেনি। আমি চাই, যেই পিশাচের হাতে এ ঘটনা ঘটছে সেই পিশাচের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়। এটা যেন সেই দেশের সরকার নিশ্চিত করে। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদা-দাদির কবরের পাশে লিমনকে দাফন করা হয়। জানাজায় জামালপুর-৩ আসনের সংসদ-সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন চৌধুরীসহ বহু মানুষ অংশ নিয়েছেন।
বিমানবন্দরে লাশ হস্তান্তর : এর আগে সকাল ৮টা ৫৯ মিনিটে এমিরেটসের একটি উড়োজাহাজে লিমনের লাশ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে ছেলের লাশ নিতে আসা লিমনের বাবা জহুরুল হক অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বিদেশে পড়তে গিয়ে আর যেন কেউ এভাবে প্রাণ না হারায়। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখের দিন আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। বলেছিল সে খুবই ব্যস্ত। কোনো ধরনের সমস্যা বা অসঙ্গতির বিষয়ে সে পরিবারকে কিছু জানায়নি। শুধু তার মাকে বলেছিল, ওই ছেলেটা সব সময় ঘরের ভেতর থাকে, অ্যাবনরমালের মতো কেমন কেমন করে। ওর মা বলেছিল, থাক বাবা ও ওর মতো থাক, তুমি তোমার মতো ভালো থাকার চেষ্টা করো।
লিমনের বাবা আরও বলেন, আমার সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে আমি নিজে অনেক কষ্ট করে ছেলে দুটোকে বড় করেছি। কোনোদিন তাদের শারীরিক আঘাত করিনি। যা শাসন করেছি মুখে। আমার ছেলেকে এভাবে মরতে হবে ওপরওয়ালা জানেন ছেলেটাকে কী কষ্ট দিয়ে মারছে।
এ সময় বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালের বাইরে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বৃষ্টির লাশও দ্রুত দেশে আনার কাজ চলছে। আমাদের বিশ্বাস, যুক্তরাষ্ট্র এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং এর জন্য যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে।
জ/দি