কোচিং বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেনে নিয়োগ ও অনিয়মের অভিযোগ
মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজে ‘দুর্নীতির জাল’, তদন্তের দাবি জোরালো
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ৯:০৯ পিএম আপডেট: ০৪.০৫.২০২৬ ১০:৩৪ পিএম

রাজধানীর অন্যতম পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মতিঝিল মডেল স্কুল এন্ড কলেজে কোচিং বাণিজ্য, নিয়োগে মোটা অংকের অর্থিক লেনদেন, পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ চৌধুরী এমদাদুল করিমের বিরুদ্ধে। তার এহেন কর্মকান্ডের অভিযোগ সামনে আসায় শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে অভিযোগও দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগের পর অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে এর প্রশাসনিক কাঠামো। তার আস্থাভাজন কিছু শিক্ষককে তাদের নির্ধারিত বিষয়ের বাইরে ক্লাস দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে, যা শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে নোটিশ ছাড়াই কোচিং বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব কার্যক্রম থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও একাধিক শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে অনিয়মের মাত্রা বেড়েছে। এনটিআরসির পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের লোকবল সংকটের চাহিদাপত্র দিতে বলা হলেও তিনি অধ্যক্ষের পদ ও বাসাবো মর্নিং স্কুল শিফটের সহকারী শিক্ষকের পদ খালি থাকলেও তিনি চাহিদাপত্র দেননি। এর কারণ তিনি যাতে আরও বেশি দিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে নিজের আখের গোছাতে পারেন।

অভিযোগে আরও জানা যায়, এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ফরম পূরণের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ এবং ৫ম ও ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ভয় দিখিয়ে কোচিংয়ে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে নেয়ার নিয়ম থাকলেও তা ভঙ্গ করে তিনি অফিস সহকারীর মাধ্যমে টাকা জমা নিচ্ছেন এবং প্রতিটি এসএমএস- দেয়ার ক্ষেত্রে ৩০ পয়সা খরচ হলেও তার নিজের ছেলের প্রতিষ্ঠান স্বাধীন ডটকম থেকে প্রতিটি এসএমএস পাঠাতে ২০ টাকা করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কয়েকজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোচিংয়ে না গেলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা বলেন। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ ও পাবলিক পরীক্ষায় পছন্দের শিক্ষকদের দায়িত্ব দেয়া, অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ এবং বিল-ভাউচার প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, আইডি কার্ড বাবদ অতিরিক্ত অর্থ আদায়, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও জানা যায়, পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন এবং দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর একাডেমিক কমিটি না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের অতীতের বড় অংকের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে কার্যকর তদন্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা। তাদের মতে, এতে অনিয়মের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে। শিক্ষক সংকটের কথা বলে অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলেও এর পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অর্থ আদায় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ভিন্নমত পোষণ করলে শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়। নারী শিক্ষকদের সঙ্গেও অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে, যা কর্মপরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবক জানিয়েছেন, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ চৌধুরী এমদাদুল করিম জানান, বিগত ১৭ বছর আন্দোলন করেছি। যারা পূর্বের সময়গুলোতে এখানে ছিলেন তারাই বিভিন্নভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করতে বিভিন্ন ভুয়া অভিযোগ করছে। তাছাড়াও এনটিআরসির চাহিদা জানিয়েছিল আগের অধ্যক্ষ থাকার সময়। ওই পদগুলোতে লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তদন্ত হলে সব কিছুই বেরিয়ে আসবে। আমি চাই বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত হোক আর সত্যিটা বের হয়ে আসুক বলে জানান তিনি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft