হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ ভারতের সমস্যা আরও বাড়াবে?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৫৯ এএম

হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের বন্দরগুলোতে যাতায়াত করা জাহাজের ওপর সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার আগেই তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে ইরানের ‘হামলাকারী জাহাজ’ যদি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কাছাকাছি আসে, তাহলে সেগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। 

সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত শান্তি আলোচনায় যুদ্ধ অবসান নিয়ে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এরপরই হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানের কোনো বন্দরে যাওয়া-আসা করছে না এমন জাহাজের পথ আটকাবে না মার্কিন বাহিনী। 

এদিকে, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ার পর অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। জ্বালানি বাজার খোলা মাত্রই সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের মূল্য ৭.৫ শতাংশ বেড়ে ১০২.৩৭ ডলার দাঁড়ায়। অন্যদিকে, ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড অয়েলের মূল্য ৮.৩ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৫৬ ডলারে পৌঁছে।

আরও পড়ুন : ৫ লাখ নথিবিহীন অভিবাসীকে বড় সুখবর দিলো স্পেন

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে সমস্যায় পড়েছে বিশ্ব। ক্রমে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। আয়ারল্যান্ডে দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে পেট্রোল ও ডিজেলের উপর ধার্য কর কমানোর কথা বলা হয়েছে। 

অস্ট্রেলিয়ায় দাম বৃদ্ধির কারণে ট্রাকের সঙ্গে যুক্ত শিল্প বড়সড় ধাক্কা খাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেলের দাম কমাতে জার্মানিও কর কমিয়েছে।বর্তমান সঙ্কট ভারতের ওপরও সর্বাঙ্গীনভাবে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর কারণ জ্বালানির দিক থেকে আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ভারত। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে দেশটিতে পেট্রোলিয়াম পণ্য আসে। 

তেলের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর ভারতের নির্ভরতা
অপরিশোধিত তেল সরবরাহের দিক থেকে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং এলএনজি এই জলপথের মাধ্যমেই পরিবহন করা হয়। ভারত তার পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে এবং এর একটা বড় অংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। একইসঙ্গে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের ভোক্তাও বটে।

আরও পড়ুন : ‘চীনা জাহাজের’ হরমুজ অতিক্রম নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, পেট্রোলিয়াম আমদানির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনা হয়েছে। এখন ৪১টি দেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করা হয়। কিন্তু বিশ্লেষকরা এই আশঙ্কায় ভুগছেন যে হরমুজের মধ্য দিয়ে সরবরাহ হওয়া তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের একটা বড় অংশ ভারত আমদানি করে।

আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হর্ষ পন্থ বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, ভারত তার তেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যার মধ্যে ৫০ শতাংশ হরমুজ হয়ে আসে। এই মুহূর্তে যা কেনা হচ্ছে সেটা চড়া দামে। (হরমুজ প্রণালিতে) অবরোধ এই সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। 

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে ভারতের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৫০% এরও বেশি মধ্যপ্রাচ্য বিশেষত ইরাক, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছিল।

প্রসঙ্গত, ২০১৯-২০২২ সালে মধ্যপ্রাচ্যের উপর ভারতের নির্ভরতা ৬০%-এরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল। এতটা নির্ভরতার কারণে, এই খাতে যে কোনো রকমের বাধা তেল সরবরাহকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ১১ মার্চ ভারত সরকারের আন্তঃমন্ত্রণালয় ব্রিফিংয়ের সময় বলা হয়েছিল যে, দেশের অপরিশোধিত তেলের আমদানির ৭০ শতাংশই সরবরাহের জন্য এখন হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে না। দেশের শক্তি সরবরাহ নিরাপদ রয়েছে। 

এলপিজি ও এলএনজি সাপ্লাইয়ের উপর প্রভাব
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দিক থেকে ভারত বিশ্বের চতুর্থ এবং এলপিজির নিরিখে দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক।

আরও পড়ুন : ইসরায়েল ও লেবানন পরবর্তী আলোচনায় বসতে সম্মত

এই আমদানি হয় মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হর্ষ পন্থ বলেন, ভারত তার এলপিজির ৬০ শতাংশই আমদানি করে, যার ৯০ শতাংশই হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। 

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার এলএনজি উৎপাদনের বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ এবং তারা নিজেদের দেশে তেলের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে।

ব্লুমবার্গের মতে, ভারত প্রয়োজনীয় এলপিজির বেশিরভাগ এবং এলএনজির দুই-তৃতীয়াংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেনে। কাতার ভারতে বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী এবং বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদনকারী দেশ।

কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার ইতোমধ্যে তার উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। কাতার বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি সরবরাহকারী দেশও বটে এবং এক্ষেত্রে প্রধান কারণ সেখানকার রাস লাফান গ্যাস ফিল্ড। এটি কাতারে ‘ক্রাউন জুয়েল’ নামেও পরিচিত এবং এখানেই হামলা করেছিল ইরান। যার ফলে ব্যপক ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিল এই গ্যাস ফিল্ড।

এই পরিস্থিতিতে, শিল্পক্ষেত্রে ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে ইতোমধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ২০ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় গৃহস্থালি, পরিবহন খাত এবং এলপিজি উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিল।

আরও পড়ুন : ভারতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার বিস্ফোরণ, নিহত ১৩

হর্ষ পন্থ জানিয়েছেন, প্রথমে ইরানের তরফে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তরফে সেখানে অবরোধের হুমকি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের বিষয়টাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায়।

যে সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী অবরোধ করবে বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেই সময় এমন খবরও ছিল যে ২০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহনকারী ইরানি ট্যাংকার ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।

গত সাত বছরে এই প্রথমবার ইরান থেকে তেল ভারতে এসেছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এই তেল আমদানি করেছে। সূত্রের খবর, আগামী দিনে ইরান থেকে আরও কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ভারতে আসবে।

মেরিন ট্রাফিক ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করে বিবিসি পারসিয়ান জানিয়েছে, রবিবার তিনটি ইরানের পতাকাবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে আরব সাগরে প্রবেশ করেছে। 

জাতিসংঘের মতে, ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া এবং ফসফেটের মতো বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার সাধারণত হরমুজ প্রণালির মধ্যে দিয়ে যায়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই রুটে সার সংক্রান্ত পণ্যের চালান প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। মার্চের শেষের দিকে প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সারের ক্ষেত্রে চীনের পর ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোক্তা। শুধু তাই নয়, কাঁচামাল এবং সমাপ্ত পণ্যের জন্য আমদানির উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। 

আরও পড়ুন : আগামী দু'দিনের মধ্যে কিছু একটা ঘটতে পারে: ট্রাম্প

এর একটা বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসে এবং হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। ভারত প্রতি বছর প্রায় ৪০ মিলিয়ন টন ইউরিয়া ব্যবহার করে। এই খাতে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়।

হর্ষ পন্থ বলছেন, ভারতে মূল বীজ বপনের মৌসুম জুন-জুলাই মাসে আসবে। ইউরিয়া তৈরির প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ভারত এর প্রায় ৮৫%  আমদানি করে। এর বেশিরভাগই আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।

ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, বিশ্বব্যাপী ফার্মা সাপ্লাই চেনে ২০ শতাংশেরও বেশি অংশীদারিত্ব ভারতের। এর মধ্যে অনেকগুলোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে পাঠানো হয়। এই ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের অনেকগুলোই উপসাগরীয় অঞ্চলের বিমানবন্দর থেকে বিশেষত দুবাই থেকে বিশ্ব বাজারে পাঠানো হয়। যুদ্ধের কারণে এই রুট প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ভারতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব
ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরান যুদ্ধের কারণে, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ২০২৭ অর্থবছরের জন্য আনুমানিক জিডিপি বৃদ্ধির হার কমিয়ে ৬.৯ শতাংশে এনেছে। গত অর্থবছরে, আনুমানিক জিডিপি বৃদ্ধি ৭.৬ শতাংশ হবে বলে মনে করা হয়েছিল।

এটা স্পষ্ট যে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের কারণে ভারতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাবের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, অপরিশোধিত তেল ছাড়াও এলএনজি, সার, রাসায়নিকের সমস্যা শিল্পের জন্য এটা একটা চ্যালেঞ্জ। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা বাড়বে, তেমনই সরকারের জন্যও কঠিন সময় হবে। 

আরও পড়ুন : যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় ইরানের ক্ষতি ২৭০ বিলিয়ন ডলার

তার মতে, আমদানির খরচ বাড়ার ফলে রাজস্ব ঘাটতিও বাড়বে এবং তা বাণিজ্য ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। অন্যদিকে ভারতীয় অর্থনীতির সামনে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। গত কয়েক মাসে ডলারের তুলনায় ভারতে টাকার দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে ভারতীয় রপ্তানির ক্ষেত্রে সুবিধা হলেও আমদানি ব্যয়বহুল হবে। এটাও সরকারের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।

তবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তরফে জানানো হয়েছে, যদি তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ হয়, তাহলে ভারতীয় অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে বছরের অন্তত দুই চতুর্থাংশ সময় লাগবে। হর্ষ পন্থ বলেছেন যে এই মুহূর্তে সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্য ঘাটতি। এরপর কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতির চ্যালেঞ্জও দেখা দেবে।

একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। আর যদি এমনটা হয়, তাহলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ভারতে আসা রেমিট্যান্সও (বিদেশি মুদ্রা পাঠানো ভারতীয়রা) ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ৯০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাস করে বলে অনুমান করা হয়। এদের বেশিরভাগই জীবিকা নির্বাহের জন্য সেখানে গেছেন। সূত্র : বিবিসি বাংলা।

জ/উ

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft