
ঐতিহাসিক চট্টগ্রামের বাশঁখালীস্থ ঋষিধামে ২২তম ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা উপলক্ষে সনাতনীদের ঢল নেমেছে। দূর দুরান্ত থেকে আসছে লাখো ভক্ত ও সন্ন্যাসী। ঋষিধাম প্রাঙ্গনে সনাতনী ভক্ত ছাড়াও অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও কুম্ভ মেলায় সামিল হচ্ছে। তারাও বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। বলতে গেলে ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলাকে ঘিরে চট্টগ্রামের ঋষিধামে বসেছে দেশের সর্ববৃহৎ অসম্প্রদায়িক মিলন মেলা।
ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতি তিন বছর পর পর বাশঁখালী চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ঋষিধামে এই ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলার আয়োজন হয়। ১৯৫৩ সালে শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পুরী মহারাজ এই কুম্ভমেলার প্রর্বতন করেন। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন স্বামীজীর মানসপুত্র শ্রীমৎ স্বামী সুদর্শনানন্দ পূরী মহারাজ।
গত দুই বছর আগে শ্রীমৎ স্বামী সুদর্শনানন্দ পুরী মহারাজ দেহত্যাগ করার পরে ওনার মানসপুত্র শ্রীমৎ স্বামী সচ্চিদানন্দ পুরী মহারাজ এই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখছেন। সমগ্র অনুষ্টানে পৌরহিত্য করছেন তিনি। গত ২৩ জানুয়ারি থেকে শ্রী গুরু সংঘের আয়োজনে ও ঋষি অদ্বৈতানন্দ পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় ১১ দিন ব্যাপী ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা শুরু হয়। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি দীক্ষাদানের মধ্য দিয়ে ১১ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হবে।
ঋষি অদ্বৈতানন্দ পরিষদের সভাপতি দেবাশীষ পালিত জানান, পূর্ণকুম্ভের অনুসরণে যুগাবতার শিবকল্পতরু শ্রী শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পূরী মহারাজ ১৯৫৩ সালে ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলার প্রবর্তন করেন। ভারতের হরিদ্বার ও উজ্জায়নীতে ৫০ বছর পর পর গঙ্গার ধারে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। শ্রীমৎ স্বামী অদ্বৈতানন্দ পূরী মহারাজ বাংলাদেশের সাধু-সন্ন্যাসী ও ভক্তদের কথা চিন্তা করে চট্টগ্রামের বাঁশখালীস্থ ঋষিধামে ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলার আয়োজন করেন। সেই থেকে এখন অবধি এই কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভ মেলা উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক চন্দ্র শেখর মল্লিক জানান, ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা দিচ্ছে। প্রতিদিন ১ থেকে ২ লাখ ভক্তের সমাগম হচ্ছে। আগত ভক্তদের জন্য প্রসাদের (ভাত-সবজি) ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে আসছে। ঘুরে ঘুরে দেখছে। তারাও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এই কুম্ভমেলাকে ঘিরে এক প্রকার অসম্প্রদায়িক মিলন মেলা বসেছে ঋষিধামে।
তিনি আরও জানান, ১১ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে সাধু-সন্ন্যাসী সম্মেলন, পঞ্চাঙ্গ সস্ত্যায়ন, দশ মহাবিদ্যা পুজা, গঙ্গা স্নান, গীতাযজ্ঞ, অন্নকুট ও ষোড়শ প্রহরব্যাপী মহানামযজ্ঞ চলছে। ১লা ফেব্রুয়ারি গীতাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। ২ ফেব্রুয়ারি দীক্ষাদান ও আগত বৈষ্ণবদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হবে।
সরজমিনে দেখা গেছে, ঋষিকুম্ভ ও কুম্ভমেলাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কড়া নিরাপত্তা দিচ্ছে। সার্বক্ষণিক আনসার ও পুলিশ সদস্যরা নিয়োজিত রয়েছে। পাশাপাশি সেনাবহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সদস্যরাও কাজ করছে। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিশাল মেলা বসেছে। হরেক রকমের মালামাল বিক্রি করছে দোকানীরা। আবার কেউ নাগরদোলা, ট্রেনে চড়ছে। কেউ বাড়ির জন্য নানা পদের পিঠা, নাড়ু-মোয়া কিনছে। রন্ধনশালায় শত শত লোক কাজ করছে। কেউ আগত ভক্তদের পানি, প্রসাদ খাওয়াচ্ছে।
দেশ-বিদেশ থেকে আগত সাধু-সন্ন্যাসীরা ধ্যানে মগ্ন রয়েছে। ভক্তরা তাদের কাছে আর্শীবাদ কামনা করছে। কেউ কেউ ঋষিধামের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে ঘুরে দেখছে। অনেকে স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য নিজেদের মোবাইলে ছবি তুলে রাখছে। লাখো লাখো ভক্ত সমাগমে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তবে অতিরিক্ত লোক সমাগমের কারণে কিছু কিছু ভক্ত অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাদের জন্য সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিমও নিয়োজিত রয়েছে। তৃষ্ণার্থ ভক্তদের পানি পান করাচ্ছে সেচ্ছাসেবীরা। রন্ধনশিল্পীরা রান্নার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে।
বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সনাতনী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ভক্ত সমাগম ঘটে বাশঁখালীস্থ ঋষিধামে। মূলত কুম্ভমেলাকে ঘিরে এই ভক্ত সমাগম হয়। তাই অনুষ্ঠান শুরু থেকে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
জ/উ