
জীবন কখনো মসৃণ পথ নয়। কখনো আনন্দ, কখনো অশ্রু, কখনো প্রাপ্তি, কখনো শূন্যতা- এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই আমাদের চলতে হয়। অনেক সময় মনে হয়, ‘এই কষ্টটা কেন আমার জীবনে?’ কিন্তু একজন মুমিন যখন এই সত্যটি মনে গেঁথে নেন যে- প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ক্বদর, তখন দুঃখও হয়ে ওঠে ইবাদত, কষ্টও হয়ে যায় সাওয়াবের সিঁড়ি। ধৈর্য তখন আর বোঝা নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্যের পথ।
ক্বদর ও ধৈর্য : একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি -
আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়াকে পরীক্ষার স্থান বানিয়েছেন। এখানে সুখ যেমন আসে, তেমনি আসে দুঃখও। তবে পার্থক্য গড়ে দেয় আমাদের প্রতিক্রিয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ لَنَبۡلُوَنَّكُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَ الۡجُوۡعِ وَ نَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَنۡفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ ؕ وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ
‘আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৫৫)
যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে- ‘এই পরিস্থিতি আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে’ সে হতাশ হয় না, ভেঙে পড়ে না; বরং ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা করে।
কুরআনের আলোকে ধৈর্যের মর্যাদা -
১. ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর বিশেষ সুসংবাদ
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
‘আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন- যারা যখন কোনো বিপদে পড়ে, তখন বলে- ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং আমরা তার দিকেই ফিরে যাব।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫–১৫৬)
২. ধৈর্যের প্রতিদান সীমাহীন -
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে অগণিতভাবে।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)
হাদিসের আলোকে ধৈর্যের সৌন্দর্য -
১. মুমিনের সব অবস্থাই কল্যাণ -
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ… إِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
‘মুমিনের বিষয়টি বিস্ময়কর! তার সব অবস্থাই কল্যাণকর। যদি সে কষ্টে পড়ে, সে ধৈর্য ধারণ করে- আর সেটাও তার জন্য কল্যাণ।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
২. ধৈর্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দান -
وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ
‘ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও বিস্তৃত কোনো দান কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি ১৪৬৯, মুসলিম ১০৫৩)
প্রতিটি মুহূর্ত ধৈর্যের ওপর অটল থাকার করণীয় -
১. ক্বদরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন
নিজেকে বারবার বলুন- ‘আল্লাহ যা করেন, তা আমার জন্যই কল্যাণ।’
২. কষ্টের সময় মুখে অভিযোগ নয়, দোয়া রাখুন
অভিযোগ মানুষকে দুর্বল করে, আর দোয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছে দেয়।
৩. সালাত ও কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করুন, আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ
‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য কামনা করো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৪৫)
৪. ধৈর্যকে ইবাদত মনে করুন
আপনি যখন কষ্ট চেপে আল্লাহর ওপর ভরসা করেন- সেই নীরব ধৈর্যও লিখিত হয় ইবাদত হিসেবে।
৫. সব অবস্থায়- ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার অভ্যাস করুন
শোকর ও সবর- এই দুই ডানায় ভর করেই মুমিন এগিয়ে যায়।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর ক্বদরের অংশ। আপনি যা পার করছেন- তা আল্লাহ জানেন, দেখেন এবং এর প্রতিদান সংরক্ষণ করে রেখেছেন। ধৈর্য মানে দুর্বলতা নয়; ধৈর্য মানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা। আজ হয়তো আপনি কাঁদছেন, কিন্তু ইনশাআল্লাহ একদিন এই ধৈর্যই হবে আপনার জান্নাতের কারণ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতিটি মুহূর্তে ধৈর্যের ওপর অটল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
জ/ই