ঘাম ঝরানো ফসল ভাসিয়ে নিল বন্যা, ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েও মাঠে ফিরছেন কৃষক
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ৬:১৪ পিএম

মাত্র কয়েক দিনের বন্যায় এক মৌসুমের সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে। মাঠভর্তি সবুজ আউশ ধান, আমনের বীজতলা আর মৌসুমি সবজির ক্ষেত এখন কেবল ধ্বংসের স্মৃতি। ফসলের সঙ্গে ভেসে গেছে কৃষকের ঘাম, শ্রম আর লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ। ঋণ করে চাষ করা অনেক কৃষক এখন দিশেহারা। তবু জীবন থেমে নেই। বন্যার পানি নামতেই আবারও জমিতে নেমেছেন তারা। কেউ কাদা সরাচ্ছেন, কেউ পলি পরিষ্কার করছেন, কেউ নতুন করে বীজতলা তৈরি করছেন। হারানো ফসল ফিরবে না, কিন্তু নতুন মৌসুমের আশা নিয়েই আবার শুরু করতে চাইছেন তারা।

সাম্প্রতিক বন্যায় মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৭০ হেক্টর আউশ ধানের জমি, ৩০ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ২৬ হেক্টর মৌসুমি সবজির ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জমিতে বন্যার সঙ্গে ভেসে আসা পলি ও বালু জমে থাকায় নতুন করে আবাদ শুরু করতেও কৃষকদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

মাঠে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক দিন আগেও যেখানে পানির নিচে ছিল বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, সেখানে এখন চলছে পুনরুদ্ধারের লড়াই। ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও শ্রমিকেরা পলি সরাচ্ছেন, আবার কোথাও নতুন করে আমনের বীজতলা তৈরির কাজ চলছে। ক্ষতির হিসাব মেলানোর সময় নেই। কারণ আমন রোপণের মৌসুম হাতছাড়া হলে সামনে আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে হবে।

মখাবিল গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, ঋণ করে দুই বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছিলাম। ফলন ভালো হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু এক রাতের বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। এখন ফসল নেই, হাতে টাকা নেই, ঋণ পরিশোধ করব কীভাবে সেটাই বুঝতে পারছি না। একই গ্রামের কৃষক তোফায়েল আহমেদ বলেন, তিনজন মিলে ১০ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছিলাম। জমি তৈরি, সার, বীজ, শ্রমিক সব মিলিয়ে অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছি। বন্যার পানিতে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

পতনঊষার এলাকার কৃষক তোয়াবুর রহমান বলেন, পানি নেমে গেলেও জমির অবস্থা ভালো নয়। ধানের গাছ দুর্বল হয়ে গেছে। এখন ফলন নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। কৃষক মাসুদ মিয়া বলেন, আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বীজ কিনতে হবে। কিন্তু হাতে টাকা নেই। সরকারি সহায়তা পেলে আবার চাষাবাদ শুরু করতে সুবিধা হবে।

ব্যাংক ঋণ নিয়ে টমেটো চাষ করা কৃষক মোশরফ বলেন, ফসল হারানোর কষ্টের চেয়ে ঋণের চিন্তা বেশি। একদিকে কিস্তি, অন্যদিকে সংসারের খরচ। এখন নতুন করে শুরু করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাচাই শেষে তাদের মধ্যে বীজ, সারসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে রয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর দ্রুত সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে কৃষকেরা আবারও উৎপাদনে ফিরতে পারেন।

প্রকৃতির এই আঘাতে কমলগঞ্জের কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়লেও তাদের মনোবল ভেঙে পড়েনি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তারা নতুন ফসলের স্বপ্ন বুনছেন। এখন তাদের প্রত্যাশা, সময়মতো সরকারি সহায়তা, কৃষি উপকরণ এবং অনুকূল আবহাওয়া মিললে আবারও সবুজে ভরে উঠবে কমলগঞ্জের মাঠ, ফিরবে কৃষকের মুখের হাসি।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft