অবৈধ হর্ন ও শব্দদূষণে বিপর্যস্ত নগরজীবন
যানজট ও নির্মাণকাজে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: রোববার, ১৯ জুলাই, ২০২৬, ৯:১৪ পিএম

রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, হাসপাতালের সামনে কিংবা আবাসিক এলাকায়—সবখানেই এখন শব্দদূষণের দাপট। যানবাহনের অবিরাম হর্ন, নির্মাণকাজের ভারী যন্ত্রপাতি, শিল্পকারখানার শব্দ এবং উচ্চক্ষমতার মাইকের ব্যবহারে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবন ক্রমেই দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব বিপর্যয়।

এমন বাস্তবতার মধ্যেই গত শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিবেশ দূষণবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বায়ু ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ইটভাটাজনিত দূষণ কমানো, রাজধানী থেকে ফিটনেসবিহীন ও পরিবেশদূষণকারী যানবাহন অপসারণ এবং অতিরিক্ত হর্নের ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানুষের জন্য সহনীয় শব্দমাত্রা ৬৫ ডেসিবেল। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত মান অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কে শব্দের মাত্রা নিয়মিতই ৯০ থেকে ১১৫ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ঘোষিত ‘সাইলেন্ট জোনে’ও প্রায় ৯৭ শতাংশ সময় শব্দমাত্রা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। ধানমন্ডির ১৭টি হাসপাতালের সামনে গড় শব্দমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৮১ দশমিক ৭ ডেসিবেল, যা নির্ধারিত মানের অনেক বেশি।

রাজধানীর ফার্মগেট, গুলিস্তান, শাহবাগ, নিউ মার্কেট, মহাখালী, নয়াপল্টন, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, প্রেস ক্লাব এলাকা ও শিয়া মসজিদ মোড়ে দিনের ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের বিকট হর্নে স্বাভাবিক কথোপকথনও কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে উত্তরা ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় চলমান নির্মাণকাজের ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণের প্রধান উৎস হলো যানবাহনের অপ্রয়োজনীয় হর্ন এবং অবৈধ হাইড্রোলিক বা প্রেশার হর্ন। এছাড়া নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা, গ্যারেজ, রেললাইন, বিমানবন্দর এবং সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্চক্ষমতার লাউডস্পিকারের ব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত শব্দের মধ্যে বসবাস করলে শুধু শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অনিদ্রা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। শিশুদের শেখার সক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যায়, আর বয়স্কদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

এ প্রসঙ্গে পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের মতে, শব্দদূষণ এখন ঢাকার অন্যতম বড় পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আদালতের মতো সংবেদনশীল এলাকায়ও কার্যকরভাবে ‘সাইলেন্ট জোন’ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবৈধ হর্ন নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা—সব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

বর্তমানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার আওতায় বিভিন্ন এলাকার জন্য শব্দের সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ঘাটতি। পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল ও নজরদারির সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে স¤প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে। রাজধানীর কাকরাইলে পরিচালিত এক মোবাইল কোর্টে অবৈধ হাইড্রোলিক হর্ন ব্যবহার ও অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টির অভিযোগে ছয়টি যানবাহনকে জরিমানা করা হয় এবং আরও ২২ জন চালককে সতর্ক করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলাতেও অবৈধ প্রেশার হর্ন জব্দ ও জরিমানার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে অবৈধ প্রেশার হর্ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে স্থায়ীভাবে ‘সাইলেন্ট জোন’ কার্যকর করা, নির্মাণকাজে শব্দনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার, পুরোনো যানবাহন অপসারণ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

দ্রুত নগরায়ণের পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবেশবিদদের মতে, শব্দদূষণকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ‘নীরব ঘাতক’-এর বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে না।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft