ছিনতাই, মাদক ও সাইবার অপরাধের বহুমাত্রিক সংকটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩৩ পিএম আপডেট: ০১.০৭.২০২৬ ৯:১৯ পিএম

বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রামে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর, শিল্পাঞ্চল, সীমান্ত এলাকা ও গ্রামাঞ্চলের সবখানেই ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং, মাদক, সংঘবদ্ধ সন্ত্রাস এবং সাইবার অপরাধের বিস্তার জননিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অপরাধের ধরন ও কৌশল বদলে যাওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা।

রাজধানীতে ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। বিশেষ করে রাতের বেলায় অলিগলি, গণপরিবহন, বাণিজ্যিক এলাকা ও নির্জন সড়ককে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে ছিনতাই করে পালিয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। ব্যবসায়ীরাও চাঁদাবাজির অভিযোগ করছেন। পুলিশ বলছে, সিসিটিভি, এআইভিত্তিক নজরদারি ও ডিজিটাল মনিটরিং বাড়ানো হলেও অপরাধীরা প্রতিনিয়ত কৌশল পরিবর্তন করছে। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শহরে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন এবং মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে একাংশের তরুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, কিশোর অপরাধ শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও পারিবারিক সংকটের প্রতিফলন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

মাদকও আইন-শৃঙ্খলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে ইয়াবা, গাঁজা ও আইস উদ্ধার হলেও সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ বলেন, মাদককে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটছে। মাদকের অর্থনৈতিক চক্র ভাঙতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তিনি সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত অভিযান পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অন্যদিকে প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। মোবাইল ব্যাংকিং জালিয়াতি, অনলাইন প্রতারণা, ফেসবুক ও হোয়্যাটসএ্যাপ আইডি হ্যাক, ভুয়া চাকরিসহ বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল চাঁদাবাজি ও আর্থিক প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অপরাধের বড় একটি অংশ এখন ভার্চুয়াল জগতে স্থানান্তরিত হয়েছে। তাই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় আধিপত্যও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বাজার, পরিবহন, জমি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত করা গেলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, হতাশা ও ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশের অভাবও গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের মতে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মকাÐ এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি, সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, এআইভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং সম্প্রসারণ, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্রিয় ভ‚মিকা, সীমান্তে কঠোর নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft