
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একমাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট, দীর্ঘদিনের শূন্যপদ, অনিয়মিত কর্মচারী এবং চিকিৎসক সংকটে স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এমনকি হাসপাতালের ফুল বাগানের মালী চালাচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্স, আর ভেষজ বাগানের পরিচর্যাকারী পালন করছেন স্টোরকিপারের দায়িত্ব। খোদ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালটিতে প্রধান অফিস সহকারী, স্টোরকিপার, অ্যাম্বুলেন্স চালক, ইসিজি টেকনিশিয়ান, আলট্রাসনোগ্রাফি টেকনিশিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ওষুধ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর তীব্র সংকট। অথচ এসব সংকটের মধ্যেও কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর ধরে স্টোরকিপারের পদ শূন্য থাকায় সেই দায়িত্ব পালন করছেন হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবার রহমান। অন্যদিকে অ্যাম্বুলেন্স চালকের পদ শূন্য থাকায় স্থানীয় চাহিদার প্রেক্ষিতে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের অনুমতিতে মালী মিলন হোসেন অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন।
হাসপাতালটিতে অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৪৩ হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। ১১ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৫ জন। মেডিসিন, গাইনি, অর্থোপেডিক ও শিশু বিভাগে বিশেষজ্ঞ সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যেই অর্থোপেডিক বিভাগের একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট দীর্ঘদিন ধরে ডেপুটেশনে অন্যত্র কর্মরত রয়েছেন।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে প্রথম শ্রেণির ১৬টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ৬টি, তৃতীয় শ্রেণির ৪৩টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৮টি পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অপারেশন কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ। ফলে সাড়ে চার লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান কেন্দ্রটি কার্যত অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে।
উপজেলার বলরামপুর ও বারোবাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রেও চিকিৎসক সংকট চরমে। বলরামপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক ছয় মাস ধরে ডেপুটেশনে অন্য জেলায় থাকায় সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ। বারোবাজার কেন্দ্রটিও চলছে জোড়াতালি দিয়ে।
এছাড়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের জন্য নিয়োজিত ১১ জন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসারের মধ্যে তিনজন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডেপুটেশনে অন্য জেলায় অবস্থান করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা কর্মস্থলে না এসেও নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে তারা ডেপুটেশনে রয়েছেন।
অন্যদিকে উপজেলার ২৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসক না থাকায় সিএইচসিপিরাই সেবা দিচ্ছেন। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতির কারণে সেবাদান ব্যাহত হচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচিতেও সংকট রয়েছে। যেখানে ৩৯ জন স্বাস্থ্য সহকারী প্রয়োজন, সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অরুণ কুমার দাস বলেন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ডেপুটেশনে থাকা চিকিৎসক ও নার্সদের বিষয়ে একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ জানান, হাসপাতালের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি অবগত রয়েছেন এবং সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন নতুন নিয়োগ না হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। ডেপুটেশনে থাকা চিকিৎসকদের বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চালক সংকটের কারণে মালী দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালানোর বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু তালিব বলেন, হাসপাতালটির অবকাঠামো ও জনবল সংকট নিরসনে এটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা প্রয়োজন। বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জ/দি