মুখোশধারীদের টার্গেট কিলিং: আতঙ্কে মানুষ
মোটরসাইকেলে এসে গুলি, অল্প সময়ে পালাচ্ছে দুর্বৃত্তরা
খন্দকার হানিফ রাজা
প্রকাশ: রোববার, ১০ মে, ২০২৬, ৭:৫৪ পিএম

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক টার্গেট কিলিং, গুলি ও পরিকল্পিত হামলার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, মুখোশ বা হেলমেট পরা দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেলে এসে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। নিহত-আহতদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। তদন্তে দেখা গেছে এসব হামলার পেছনে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক বিরোধ ও ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে এমন ঘটনা ঘটছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।

সা¤প্রতিক পরিকল্পিত হামলার ঘটনাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, হামলাকারীরা সাধারণত ২ থেকে ৪ জনের দলে থাকে। তারা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে টার্গেটকে খুব কাছ থেকে গুলি করে পালিয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হামলাকারীদের মুখ মাস্ক, হেলমেট বা কালো কাপড়ে ঢাকা থাকে। এসব ঘটনায় পেশাদার অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

রাজধানীতে সংঘটিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, গত ২৮ এপ্রিল রাতে নিউমার্কেট এলাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটনকে মোটরসাইকেল আরোহী মাস্ক পড়া দুই দুর্বৃত্ত খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে ৫-৬ রাউন্ড গুলি ছোড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ৬ মে রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ প্রধান (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, টিটন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের তদন্ত চলমান। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

গত ৭ জানুয়ারি রাত ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে রাজধানীর তেজগাঁও থানা এলাকার পশ্চিম তেজতুরী বাজার এলাকায় (কারওয়ান বাজার স্টার কাবাবের পেছনে) মোটর সাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে ৫ রাউন্ড গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনায় আহত হন সুফিয়ান ব্যাপারী মাসুদ নামের অপর ব্যক্তি। হামলাকারীদের একজনের মুখে কালো মাস্ক ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন।

তদন্তে গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেয় পলাতক সন্ত্রাসী “দিলীপ দাদা”। কাওরান বাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির বিরোধ ছিল হত্যাকান্ডের মূল কারণ। এ ঘটনায় শ্যুটার হিসেবে ‘রহিম’ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনের ওপর নজরদারি চলছে বলে জানা গেছে।

অপরদিকে, গত ২৬ এপ্রিল রবিবার রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ঢেমশা ইউনিয়নের রাস্তার মাথা মডেল মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ব্যবসায়ী মুহাম্মদ শাহাদাতকে (৩০) মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে। স্থানীয়দের ভাষ্যানুযায়ী, হামলাকারীরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ওই ঘটনায় দুই দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

গত ৪ মার্চ খুলনা নগরীর ডাকবাংলো মোড়ের বাটা শো-রুমের সামনে রাত সোয়া ৯টার দিকে স্থানীয় শ্রমিক দলের রাজনীতির সাথে জড়িত মাসুম বিল্লাহ (৪৫) নামে এক নেতাকে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা তাকে ঘিরে ধরে প্রথমে গুলি করে ও পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। তিনি রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীরা হেলমেট পরে ছিল এবং পুরো ঘটনা ২০ সেকেন্ডের মধ্যে শেষ করে পালিয়ে যায়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ পুলিশ অশোক ঘোষ নামে এক ব্যক্তিকে বিদেশি পিস্তলসহ আটক করে।

গত ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বাদশা নামের এক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা মোবাইল ফোনে ভিডিও করায় সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার আসাদুজ্জামান তুহিনকে (৩৮) কুপিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৭ জনকে আটক করে পুলিশ। 

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ড. নজমুল করিম খান বলেন, তুহিন একটি ‘হানিট্র্যাপ’ ঘটনার ভিডিও ধারণ করেছিলেন। সেটি দেখে ফেলায় হামলাকারীরা তাকে টার্গেট করে।
 
র‍্যাবের সাবেক মিডিয়া পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, “অপরাধীরা আগে থেকেই টার্গেটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে হামলা চালায় বলে জানান তিনি।

এসব ঘটনা প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অপরাধীরা এখন সংগঠিত ও প্রযুক্তিসচেতন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সমানভাবে আধুনিক হতে হবে।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. জিয়া রহমানের মতে, টার্গেট কিলিংয়ের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থও জড়িত থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি কারণে এ ধরণের অপরাধ বাড়ছে, যার মধ্যে রয়েছে, সহজে পরিচয় গোপন করা যায়। মোটরসাইকেলে দ্রুত পালানো সম্ভব। অনেক এলাকায় সিসিটিভির ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় এমন ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বেশি দেখা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজধানীর এক ব্যবসায়ী বলেন, “দিনের আলোতে যদি এভাবে গুলি করে চলে যেতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?”

তবে এসব ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। মোটরসাইকেলভিত্তিক অপরাধচক্রের তালিকা করা হচ্ছে। সিসিটিভি বিশ্লেষণ জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপসংহার

বাংলাদেশে মুখোশধারী দুর্বৃত্তদের টার্গেট কিলিং এখন আইনশৃঙ্খলার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় গ্রেপ্তার হলেও অধিকাংশ ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। দ্রুত তদন্ত, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের আর্থিক উৎস বন্ধ করা ছাড়া এ ধরণের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: info@jobabdihi.com , contact@jobabdihi.com
কপিরাইট © দৈনিক জবাবদিহি সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft