
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার লেদামদি গ্রামের আবুল হাসেম রতন। স্থানীয়ভাবে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিনযাবত গড়ে তুলেছে ভয়ংকর প্রতারণার সাম্রাজ্য। ব্যবসা স¤প্রসারণ, জমি কেনাবেচা, রাজনৈতিক প্রভাব ও নানা মিথ্যা প্রলোভনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একাধিক মামলার আসামি এই রতন বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, রতনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। গত ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর দায়ের হওয়া একটি সিআর মামলায় (নম্বর-১২২/২৪) তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছেন। এর আগে ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি সোনারগাঁও থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলাতেও তার বিরুদ্ধে দÐবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
এছাড়া ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় দায়ের হওয়া প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলায় রতন ও তার বড় ভাই আবুল কাসেম খোকনকে আসামি করা হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওয়ালটন গ্রুপের এক্সক্লুসিভ ডিলার হিসেবে ব্যবসা শুরু করে ‘স্বর্ণা ইলেকট্রনিক্স’-এর মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ পণ্য বাকিতে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন তারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে কামরাঙ্গীরচরে ওয়ালটনের ডিলারশিপ নেয়ার পর শুরুতে নগদ ও নিয়মিত লেনদেনের মাধ্যমে কোম্পানির আস্থা অর্জন করেন রতন। পরে ধীরে ধীরে অধিক পরিমাণ পণ্য বাকিতে নিতে থাকেন। একপর্যায়ে ওয়ালটন ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, পাওনা টাকা চাইতে গেলে উল্টো হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম ‘আবুল হাসেম রতন’ হলেও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তিনি ‘রতন মিয়া’ নাম ব্যবহার করতেন। ৩ বছর আগে কামরাঙ্গীরচরের ওই শো-রুম বন্ধ হয়ে গেলেও কোম্পানি এখনও তার অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছিলেন রতন। তার বড় ভাই স্থানীয় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে অভিযোগ ধামাচাপা দেয়া হতো। জমি কেনাবেচা, তদবির বাণিজ্য ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কামরাঙ্গীরচরের কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রতন বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করতেন। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন তিনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থ আত্মসাতের পর প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারও চালাতেন রতন। ভাড়াটে লোক এনে মানববন্ধন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ প্রসঙ্গে সিআইডি সদর দপ্তরের বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, “এ ধরণের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি।”
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোঃ শামসুল হক বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় শুধু মামলা করলেই হবে না, দ্রæত কার্যকর তদন্ত ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে” বলে জানান তিনি।